Subjects & Chapters

Chapters

সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশ.. সমাজবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক মর্যাদা সমাজবিজ্ঞানীদের মতবাদ ও অবদান সমাজবিজ্ঞানর মৌল প্রত্যয়. সামাজিক প্রতিষ্ঠান. সামাজজীবনের প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান.. সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া. সামাজিক স্তর বিন্যাস ও অসমতা. সামাজিক ব্যবস্থা.... বিচ্যুতিমূলক আচরণ এবং অপরাধ.. সামাজিক পরিবর্তন. বাংলাদেশের সামাজিক চর্চার বিকাশ... বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি প্রত্নতত্ত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সমাজ ও সভ্যতা বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের গ্রামীন ও শহুরে সমাজ বাংলাদেশের বিবাহ, পরিবার ও জ্ঞাতিসম্পর্ক, বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা ও প্রতিকারের উপায়. বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়ন
সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশ - লেকচারশীট
Full Page Thumbnail

সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি ও বিকাশ

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতির মাস্টারক্লাস

আজকের আলোচ্য বিষয়ের ধাপসমূহ (সূচিপত্র)
সমাজবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা ও শাব্দিক উৎপত্তি
বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ
সমাজবিজ্ঞানের প্রামাণ্য সংজ্ঞাসমূহ
সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য
সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক পরিধি ও শাখাসমূহ
সমাজবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তু
সমাজবিজ্ঞান পাঠের একান্ত প্রয়োজনীয়তা
সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তির ঐতিহাসিক পটভূমি
সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীর অবদান
১০ অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক
১১ ভর্তি পরীক্ষার জন্য চূড়ান্ত এককথায় তথ্য (One-Liner Data)

চলো এবার আমরা মূল আলোচনায় প্রবেশ করি। ক্লাসটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে যেকোনো একাডেমিক পরীক্ষায় তোমরা একদম ১০০ তে ১০০ প্রস্তুতি নিতে পারো। খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়ো, চলো শুরু করা যাক!

১. সমাজবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা ও শাব্দিক উৎপত্তি
  • শুরুতেই চলো জেনে নিই সমাজবিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা সম্পর্কে। সমাজবিজ্ঞান হলো সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বা নবীনতম একটি শাখা।
  • মানবসমাজের উৎপত্তি, বিকাশ, মানুষের আচার-আচরণ এবং সমাজবদ্ধ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে এই শাস্ত্র অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়ন করে।
  • ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব ঘটে।
  • ফরাসি দার্শনিক ও সমাজচিন্তাবিদ অগাস্ট কোঁৎ ১৮৩৯ সালে সর্বপ্রথম তাঁর ‘Positive Philosophy’ নামক গ্রন্থে একটি নতুন বিজ্ঞান হিসেবে সমাজবিজ্ঞান বা সমাজতত্ত্বের ধারণা প্রদান করেন।
  • প্রথমে তিনি এই শাস্ত্রটির নাম দিয়েছিলেন ‘সামাজিক পদার্থবিদ্যা’ বা Social Physics, কিন্তু পরবর্তীতে এর নামকরণ করেন ‘সমাজবিজ্ঞান’ বা Sociology। (ভাবো তো একবার, সমাজবিজ্ঞানের নাম যদি সোশ্যাল ফিজিক্সই থেকে যেত, তাহলে আর্টসের স্টুডেন্টদেরও বুক ফুলিয়ে বলতে হতো "আমি ফিজিক্স পড়ি!" ভাগ্যিস অগাস্ট কোঁৎ নামটা বদলে দিয়েছিলেন!)
  • সমাজবিজ্ঞান বা ‘Sociology’ শব্দটি মূলত দুটি ভিন্ন ভাষার শব্দের চমৎকার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে:
    • Socius (ল্যাটিন শব্দ): যার আভিধানিক অর্থ হলো সঙ্গী বা সমাজ
    • Logos (গ্রিক শব্দ): যার অর্থ হলো অধ্যয়ন, বিজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞান
  • সুতরাং, বুৎপত্তিগত বা শাব্দিক অর্থে বলা যায়, যে বিজ্ঞান সমাজ বা সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন করে, তাকেই সমাজবিজ্ঞান বলা হয়।
  • বাংলা ভাষায় ‘Sociology’-এর সঠিক প্রতিশব্দ হিসেবে ‘সমাজবিজ্ঞান’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকার
২. বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ
  • বিশ্বজুড়ে তো সমাজবিজ্ঞানের শুরুটা দেখলাম, কিন্তু আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে এর যাত্রাটা কেমন ছিল? বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ ঊনবিংশ শতাব্দীতে হলেও আমাদের অঞ্চলে এর প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হতে কিছুটা সময় লাগে।
  • ১৯২৬ সাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে সর্বপ্রথম সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে পঠন-পাঠন শুরু হয়।
  • ১৯৫৭-৫৮ শিক্ষাবর্ষ: ড. এ. কে. নাজমুল করিমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
  • আর ঠিক এ কারণেই ড. নাজমুল করিমকে বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
  • মনোযোগ দাও সবাই! এখান থেকে কিন্তু এমসিকিউ আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি! বিশেষ করে ড. এ. কে. নাজমুল করিমের নামটা একদম মুখস্থ করে ফেলবে।
৩. সমাজবিজ্ঞানের প্রামাণ্য সংজ্ঞাসমূহ
  • এবার চলো, বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা সমাজবিজ্ঞানকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন সেটা দেখে নিই। সমাজবিজ্ঞানের সর্বজনীন কোনো একক সংজ্ঞা নেই, কারণ বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন।
  • ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, "সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সামাজিক অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান।"
  • সমাজবিজ্ঞানী আর. এম. ম্যাকাইভার ও চার্লস এইচ. পেজ বলেছেন, "সমাজবিজ্ঞানই একমাত্র বিজ্ঞান যা সমাজ এবং সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে অধ্যয়ন করে।"
  • জার্মান সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার সমাজবিজ্ঞানকে মানবগোষ্ঠী ও সামাজিক কার্যাবলির বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

কী? এতগুলো সংজ্ঞা দেখে মাথা ঘুরছে? কোনো চিন্তা নেই! তোমাদের জন্য দারুণ একটি হ্যাক আছে। পুরো সংজ্ঞা মুখস্থ করার কোনো দরকার নেই। আমরা শুধু কিওয়ার্ড বা মূল শব্দ মনে রাখবো! ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত পুরো সংজ্ঞা মুখস্থ লিখতে হয় না; বরং একটি উক্তি দিয়ে জানতে চাওয়া হয় এটি কার। তাই ‘কিওয়ার্ড ম্যাপিং’ কৌশলটি মনে রাখো:

সমাজবিজ্ঞানী মনে রাখার কিওয়ার্ড
এমিল ডুর্খেইম অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান
ম্যাকাইভার ও পেজ সামাজিক সম্পর্ক
ম্যাক্স ওয়েবার মানবগোষ্ঠী ও সামাজিক কার্যাবলি
ডেভিড পোপেনো সুশৃঙ্খল এবং বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়ন
অগবার্ন ও নিমকফ বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন

এই তো, কিওয়ার্ডগুলো ধরে ফেললে এখন আর কোনো সংজ্ঞাই কঠিন লাগবে না।

৪. সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য

সমাজবিজ্ঞানের নিজস্ব কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি রয়েছে, যা একে অন্যান্য শাস্ত্র থেকে আলাদা করেছে:

  • সমাজের পূর্ণাঙ্গ পাঠ: অর্থনীতি বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেমন সমাজের একটি নির্দিষ্ট দিক নিয়ে আলোচনা করে, সমাজবিজ্ঞান গোটা সমাজকে নিয়ে সামগ্রিক অধ্যয়ন করে।
  • কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়: সমাজবিজ্ঞান কেবল সমাজের ঘটনাবলির আলোচনাই করে না, বরং ঐ ঘটনাসমূহের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করে।
  • মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান: সমাজবিজ্ঞানী ব্যক্তিগত আবেগ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে বস্তুনিষ্ঠ ফলাফল তুলে ধরেন।
  • তাত্ত্বিক বিজ্ঞান: এটি মূলত একটি তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো গবেষণাগারে একে পরীক্ষা করা যায় না।
৫. সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক পরিধি ও শাখাসমূহ

মজার ব্যাপার হচ্ছে, সমাজবিজ্ঞানকে তুমি ল্যাবে টেস্ট করতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু পুরো সমাজটাই এর বিশাল এক ল্যাবরেটরি! সমাজবিজ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। এর গুরুত্বপূর্ণ শাখাসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো:

  • ঐতিহাসিক সমাজবিজ্ঞান: যা প্রাচীন সমাজের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে।
  • পরিবারের সমাজবিজ্ঞান: পরিবারের উৎপত্তি, বিবাহ প্রথা নিয়ে অনুসন্ধান চালায়।
  • সামাজিক জনবিজ্ঞান: গবেষণা করে জনসংখ্যা নিয়ে।
  • গ্রামীণ ও নগর সমাজবিজ্ঞান: গ্রাম এবং শহরের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রদান করে।
  • অন্যান্য শাখা: ধর্মের সমাজবিজ্ঞান, শিক্ষার সমাজবিজ্ঞান এবং অপরাধ সমাজবিজ্ঞানের মতো শাখাগুলো আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে।

এই শাখাগুলোর নাম শুনলেই বোঝা যায়, আমাদের জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে সমাজবিজ্ঞানের ছোঁয়া নেই!

৬. সমাজবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তু

সমাজবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে সমাজবিজ্ঞানী অ্যালেক্স ইংকেলস প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করেছেন:

১. বিশ্লেষণাত্মক সমাজবিজ্ঞান
২. গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপাদানসমূহ
৩. মৌলিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান
৪. সামাজিক প্রক্রিয়া
  • সমাজের বৃহৎ পরিসর যেমন রাষ্ট্র বা অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র পরিসর যেমন পরিবার বা বন্ধুগোষ্ঠী—উভয় স্তরই সমাজবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত।
  • সমাজবিজ্ঞানী সি. ডব্লিউ. মিলসও সমাজবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে এই বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র পরিসরেই ভাগ করেছেন।
৭. সমাজবিজ্ঞান পাঠের একান্ত প্রয়োজনীয়তা

তোমরা অনেকেই ভাবতে পারো, এত কিছু জেনে আমার কী লাভ? আসলে, সমাজবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম:

  • সমাজকে নিখুঁতভাবে জানতে ও বুঝতে সমাজবিজ্ঞান পাঠের কোনো বিকল্প নেই।
  • সমাজবদ্ধ মানুষের আচার-আচরণ, রীতিনীতি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করার জন্য এর জ্ঞান অপরিহার্য।
  • সমাজের বিভিন্ন সমস্যা যেমন—দারিদ্র্য, অপরাধ, বেকারত্ব বা মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মূল কারণ অনুসন্ধান এবং তা প্রতিকারের উপায় নির্ধারণে সমাজবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
  • সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যয়ন অত্যন্ত সহায়ক।

তো বুঝতেই পারছো, আমরা শুধু বইয়ের পাতায় আবদ্ধ নেই, আমরা আসলে পুরো সমাজটাকে পড়তে শিখছি!

৮. সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তির ঐতিহাসিক পটভূমি
  • এবার একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলানো যাক, সমাজবিজ্ঞানের জন্মটা ঠিক কোথায় এবং কীভাবে হলো? সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব হঠাৎ করে একদিনে হয়নি; এর পেছনে একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।
  • বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব এবং ফরাসি বিপ্লব সমাজবিজ্ঞান বিকাশে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছিল।
  • সমাজবিজ্ঞানী মরিস জিন্সবার্গ সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভবের পেছনে চারটি মূল উপাদানের কথা বলেছেন:
    ১. রাজনৈতিক দর্শন ২. ইতিহাসের দর্শন ৩. জীববিজ্ঞানের বিবর্তন তত্ত্ব ৪. সামাজিক জরিপ
  • চার্লস ডারউইনের জীববিজ্ঞানের বিবর্তন তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের চিন্তাধারায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
  • হার্বার্ট স্পেন্সারের মতো দার্শনিকগণ সমাজকে জীবদেহের সাথে তুলনা করে সামাজিক বিবর্তনবাদের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
৯. সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীর অবদান

এই বিবর্তনের ধারায় অনেক জ্ঞানী মানুষ তাঁদের মেধা দিয়ে সমাজবিজ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন:

  • প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর 'দি রিপাবলিক' গ্রন্থে এবং অ্যারিস্টটল তাঁর 'পলিটিক্স' গ্রন্থে সমাজের রূপরেখা তুলে ধরেন। অ্যারিস্টটলই বলেছিলেন, "মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব।"
  • মধ্যযুগের বিখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ ইবনে খালদুনকে সমাজবিজ্ঞানের আদি পথিকৃৎ বলা হয়। তাঁর ‘আল-উমরান’ প্রত্যয়টি খুবই বিখ্যাত।
  • ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ হলেন সমাজবিজ্ঞানের জনক, যিনি সমাজ বিকাশের বিখ্যাত 'ত্রয়স্তর সূত্র' প্রদান করেন।
  • জার্মান সমাজদার্শনিক কার্ল মার্ক্স তাঁর ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং ‘দাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থের জন্য চিরস্মরণীয়।
  • এছাড়া এমিল ডুর্খেইম এবং ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিক সমাজবিজ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দানে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন।

এতজন বিজ্ঞানীর নাম আর বইয়ের নাম একসাথে মনে রাখা একটু কঠিন, তাই না? তোমাদের কাজ সহজ করার জন্য একটা চমৎকার ম্যাট্রিক্স আছে। খাতায় নোট করে নাও:

সমাজবিজ্ঞানী বিখ্যাত গ্রন্থ মূল অবদান
অগাস্ট কোঁৎ Positive Philosophy সমাজবিজ্ঞানের নামকরণ ও ত্রয়স্তর সূত্র
কার্ল মার্ক্স দাস ক্যাপিটাল শ্রেণিসংগ্রাম
ইবনে খালদুন মুকাদ্দিমা আল-উমরান প্রত্যয়
লুইস হেনরি মর্গান Ancient Society বিবর্তনের তিন স্তর

এই ছকটা ভর্তি পরীক্ষার জন্য রীতিমতো গেম-চেঞ্জার! একদম ঠোঁটস্থ করে ফেলবে।

১০. অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক

আমাদের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। অন্যান্য বিষয়ের সাথে সমাজবিজ্ঞানের কী সম্পর্ক?

  • সমাজবিজ্ঞানের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
  • ইতিহাসের সাথেও এর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ডেনিশ সমাজতাত্ত্বিক ভন বোলো তো বলেইছেন, "ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করলে সমাজবিজ্ঞান হতে পারে না।"
  • অর্থনীতি আলোচনা করে উৎপাদন ও বণ্টন নিয়ে, যার সাথে সমাজের গভীর সম্পর্ক।
  • অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক বিধায় এদেরকে 'জমজ বোন' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

জমজ বোনের কনসেপ্টটা দারুণ, তাই না? এবার আমরা চলে এসেছি আমাদের মাস্টারক্লাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং হাই-ভোল্টেজ সেকশনে!

১১. ভর্তি পরীক্ষার জন্য চূড়ান্ত এককথায় তথ্য (One-Liner Data)

নিচের প্রতিটি লাইন ভর্তি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শব্দগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়বে।

১. সমাজবিজ্ঞানের জনক হলেন ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ
২. 'Sociology' শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮৩৯ সালে
৩. 'Sociology' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Socius' এবং গ্রিক শব্দ 'Logos' থেকে এসেছে।
৪. ল্যাটিন 'Socius' শব্দের অর্থ হলো সঙ্গী বা সমাজ
৫. গ্রিক 'Logos' শব্দের অর্থ হলো বিশেষ জ্ঞান বা অধ্যয়ন
৬. অগাস্ট কোঁৎ-এর জগৎবিখ্যাত গ্রন্থের নাম 'Positive Philosophy'
৭. অগাস্ট কোঁৎ সমাজবিজ্ঞানকে শুরুতে 'সোশ্যাল ফিজিক্স' নাম দিয়েছিলেন।
৮. সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বা নবীনতম শাস্ত্র হলো সমাজবিজ্ঞান।
৯. বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের জনক বলা হয় ড. এ. কে. নাজমুল করিমকে
১০. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৭-৫৮ সালে
১১. "সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান"—উক্তিটি এমিল ডুর্খেইমের
১২. "সমাজবিজ্ঞানই একমাত্র বিজ্ঞান যা সমাজ এবং সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ে অধ্যয়ন করে"—উক্তিটি ম্যাকাইভার ও পেজের
১৩. সমাজবিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য হলো সামাজিক সম্পর্কের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করা।
১৪. সমাজকাঠামো হলো সমাজবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়।
১৫. সমাজবিজ্ঞান একটি সম্পূর্ণ মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান।
১৬. অগাস্ট কোঁৎ আলোচ্য বিষয়ের দিক থেকে সমাজবিজ্ঞানকে স্থিতিশীলতা এবং গতিশীলতা—এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন।
১৭. প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম 'দি রিপাবলিক' (The Republic)
১৮. অ্যারিস্টটলের বিশ্বখ্যাত গ্রন্থের নাম 'পলিটিক্স' (Politics)
১৯. "মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব"—এই বিখ্যাত উক্তিটি অ্যারিস্টটলের
২০. ইতালীয় দার্শনিক ম্যাকিয়াভেলির বিখ্যাত গ্রন্থের নাম 'দি প্রিন্স' (The Prince)
২১. ইবনে খালদুনের ব্যবহৃত 'আল-উমরান' প্রত্যয়টি সমাজবিজ্ঞানের প্রতিশব্দ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২২. ইবনে খালদুনকে জার্মান সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মার্ক্সের পূর্বসূরি বলা হয়।
২৩. 'The New Science' গ্রন্থের রচয়িতা হলেন গিয়ামবাতিস্তা ভিকো
২৪. 'Ancient Society' গ্রন্থের রচয়িতা হলেন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী লুইস হেনরি মর্গান
২৫. মর্গান সমাজ বিবর্তনের তিনটি স্তর দিয়েছেন: বন্যদশা, বর্বরদশা ও সভ্যতা
২৬. অগাস্ট কোঁৎ সমাজ বিকাশের যে তিনটি স্তরের কথা বলেছেন তা 'ত্রয়স্তর সূত্র' নামে পরিচিত।
২৭. ত্রয়স্তর সূত্রের তিনটি স্তর হলো: ধর্মতাত্ত্বিক, অধিবিদ্যাগত এবং দৃষ্টবাদী স্তর
২৮. জীববিজ্ঞানের যুগান্তকারী বিবর্তন তত্ত্বের প্রবর্তক হলেন চার্লস ডারউইন
২৯. ইংরেজ সমাজ-দার্শনিক টমাস মুরের বিখ্যাত গ্রন্থের নাম 'Utopia'
৩০. সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তির মূলে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লবের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
৩১. "ইতিহাস রচনার আগে ইতিহাসবিদদের সমাজ সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে"—উক্তিটি ইবনে খালদুনের
৩২. সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান শাস্ত্র দুটিকে একে অপরের 'জমজ বোন' বলা হয়।
৩৩. সাহিত্য সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে বলে সাহিত্যকে বলা হয় সমাজের দর্পণ
৩৪. সমাজবিজ্ঞান কোনো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয়, এটি একটি বস্তুনিষ্ঠ সামাজিক বিজ্ঞান
৩৫. কার্ল মার্ক্সের বিশ্বখ্যাত একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রন্থ হলো 'দাস ক্যাপিটাল'
৩৬. সমাজবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্বের প্রবর্তক হলেন কার্ল মার্ক্স।
৩৭. "ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মালিকানাই সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও শোষণের মূল"—উক্তিটি কার্ল মার্ক্সের
৩৮. সমাজ মনোবিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য হলো সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির আচরণ বা ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ।
৩৯. মানবসেবায় সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকেই সমাজকল্যাণ বলা হয়।
৪০. অর্থনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় মূলত তিনটি: উৎপাদন, বণ্টন ও ভোগ
৪১. ফ্রেডারিখ লো প্লে সামাজিক ঘটনা বিশ্লেষণে সর্বপ্রথম 'কেস স্টাডি' পদ্ধতির প্রবর্তন করেন।
৪২. 'The Ancient Regime and the French Revolution' গ্রন্থের রচয়িতা এলেক্সিস ডি টকভিলে
৪৩. 'Wealth of Nation' গ্রন্থের রচয়িতা হলেন স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ
৪৪. বিংশ শতকের প্রথম ধাপে নগর সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক বিকাশ ঘটে।
৪৫. দৃষ্টবাদী মতবাদ সমাজ বিশ্লেষণে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পদ্ধতি অনুসরণ করার ওপর গুরুত্ব দেয়।
৪৬. সমাজবিজ্ঞান সমাজ সম্পর্কিত একটি বিশ্লেষণধর্মী এবং তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, এটি কোনো ব্যবহারিক বিজ্ঞান নয়
৪৭. সমাজের মৌল বা ভিত্তি কাঠামো হিসেবে অর্থনীতিকে বিবেচনা করা হয়।
৪৮. জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্র এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন।
৪৯. "সমাজবিজ্ঞান সমাজকে ব্যাপকভাবে এবং সামগ্রিকভাবে অধ্যয়ন করে"—এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রকৃতি।
৫০. সমাজবিজ্ঞানের পরিধি সামাজিক পরিবর্তনশীলতা এবং মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল।
৫১. বাংলা ভাষায় ‘সমাজবিজ্ঞান’ শব্দটির প্রথম ব্যবহারকারী হলেন অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকার
৫২. সমাজবিজ্ঞান ও সমাজতন্ত্রের আদি প্রবক্তা হলেন সেন্ট সাইমন
৫৩. সমাজ বিবর্তনের তিনটি যুগের (দেবতা, বীরযোদ্ধা, মানুষ) কথা বলেছেন গিয়ামবাতিস্তা ভিকো
৫৪. সমাজ বিবর্তনের বন্যদশা, বর্বরদশা ও সভ্যতা—এই তিন স্তরের প্রবক্তা হলেন লুইস হেনরি মর্গান
৫৫. প্রাচীন ভারতের সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র'-এর রচয়িতা কৌটিল্য
৫৬. সমাজ গবেষণায় সর্বপ্রথম 'একক বিষয় অধ্যয়ন' পদ্ধতির প্রবর্তন করেন ফ্রেডারিখ লো প্লে।
৫৭. সমাজবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে বৃহৎ পরিসর ও ক্ষুদ্র পরিসর—এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন সি. ডব্লিউ. মিলস
৫৮. "ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করলে সমাজবিজ্ঞান হতে পারে না"—উক্তিটি ভন বোলোর
৫৯. 'দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন' গ্রন্থের রচয়িতা হলেন কার্ল পোলানি
৬০. মানব ব্যক্তিত্বের তিনটি সত্তার বিশ্লেষণ প্রদান করেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড