অপরিচিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (লেকচারশীট)
Full Page Thumbnail

অপরিচিতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিশ্লেষণমূলক অধ্যয়ন নির্দেশিকা

আজকের আলোচ্য বিষয়ের সূচিপত্র (ধাপে ধাপে)

গল্পের উৎস, প্রকাশকাল ও ধরন
লেখক পরিচিতি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
মূল চরিত্র বিশ্লেষণ: অনুপম
মূল চরিত্র বিশ্লেষণ: কল্যাণী
গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র: মামা ও শম্ভুনাথ সেন
অন্যান্য চরিত্র: হরিশ, বিনু দাদা ও মা
গল্পের মনস্তাত্ত্বিক রূপক ও উপমা
বিবাহ ও যৌতুক প্রথার নির্মমতা
বিবাহভঙ্গ ও ব্যক্তিত্বের জাগরণ
১০ রেলগাড়ির ঘটনা ও নারীশক্তির উন্মেষ
১১ গল্পের সমাপ্তি ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য
১২ ভর্তি পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও টীকা
১৩ চূড়ান্ত বহুনির্বাচনি (MCQ) তথ্যকণিকা (৫০টি)

চলো, এবার প্রতিটি অনুযায়ী আমরা আমাদের মূল ও বিস্তারিত আলোচনায় প্রবেশ করি।

চরিত্রগুলোর ভিজ্যুয়াল ডায়াগ্রাম

[ মামা ]
⟵ (অন্ধ আনুগত্য ও পরনির্ভরশীলতা) ⟶ (শোষক, লোভী ও নিয়ন্ত্রক)
[ অনুপম ]
[ কল্যাণী ]
⟵ (প্রত্যাখ্যান ও আত্মবিকাশ) ⟶ (আকর্ষণ ও নিষ্ক্রিয়তা)
[ অনুপম ]
[ শম্ভুনাথ সেন ]
⟵ (আদর্শের কাছে পরাজয় ও নীরবতা) ⟶
[ অনুপম ]

Slide 1: ‘অপরিচিতা’ গল্পের প্রাথমিক ধারণা ও বিষয়বস্তু

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অপরিচিতা’ একটি সার্থক এবং কালজয়ী ছোটগল্প।
  • তৎকালীন সমাজের নিচু মানসিকতা, যৌতুক প্রথা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চরম অমানবিকতার বিরুদ্ধে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের এক অসাধারণ আখ্যান এই গল্পটি।
  • গল্পটিতে মূলত আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এক নারীর বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের জাগরণ দেখানো হয়েছে। গল্পের আড়ালে থাকা সেই ‘অপরিচিতা’ নারীটি হলো কল্যাণী
  • অন্যদিকে গল্পের নায়ক অনুপমের ব্যক্তিত্বহীনতা এবং মাতৃ ও মাতুল-নির্ভরতার কারণে কীভাবে তার জীবন শূন্যতায় পরিণত হয়, তারই এক অকপট স্বীকারোক্তি এই গল্প।
  • ভর্তি পরীক্ষার জন্য মনে রাখতে হবে, এটি যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি জোরালো প্রতিবাদী গল্প

Slide 2: লেখক পরিচিতি: জন্ম ও পরিবার

  • বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ মে (বাংলা ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
  • তাঁর ছদ্মনাম ছিল ‘ভানুসিংহ ঠাকুর’। ভর্তি পরীক্ষায় প্রায়ই প্রশ্ন আসে তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডল নিয়ে।
  • তাঁর পিতার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতার নাম সারদা দেবী। তাঁর পিতামহ ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর
  • রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান এবং অষ্টম পুত্র
  • এই পারিবারিক পরিমণ্ডল এবং জমিদারির কারণে তিনি বাংলাদেশের শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরে জীবনের একটি বড় সময় অতিবাহিত করেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর পিতামাতার চতুর্দশ (১৪তম) সন্তান এবং অষ্টম পুত্র। বাংলাদেশের শিলাইদহে তাঁর বসবাসের সময়টিকে রবীন্দ্র-সাহিত্যে ছোটগল্প রচনার 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

Slide 3: লেখক পরিচিতি: সাহিত্যকর্ম ও স্বীকৃতি

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র পনেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বনফুল’ প্রকাশ করেন এবং মাত্র ষোলো বছর বয়সে ‘ভিখারিণী’ গল্প রচনার মাধ্যমে ছোটগল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
  • তাঁর রচিত ছোটগল্পের সংখ্যা ১১৯টি, যার অধিকাংশই ‘গল্পগুচ্ছ’ গ্রন্থে সংকলিত। তাঁর শেষ গল্পের নাম ‘মুসলমানীর গল্প’
  • তিনি ১৯১৩ সালে তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস’ (Song Offerings)-এর জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
  • এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৩ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৬ সালে এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪০ সালে তিনি ‘ডিলিট’ উপাধি লাভ করেন।
  • ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Slide 4: ‘অপরিচিতা’ গল্পের উৎস ও প্রকাশকাল

  • ভর্তি পরীক্ষার বহুনির্বাচনি প্রশ্নের জন্য এই টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • ‘অপরিচিতা’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত মাসিক ‘সবুজপত্র’ পত্রিকায়।
  • এটি ১৩২১ বঙ্গাব্দের (১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ) কার্তিক সংখ্যায় প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।
  • পরবর্তীতে এই গল্পটি রবীন্দ্র-গল্পের সংকলন ‘গল্পসপ্তক’-এ স্থান পায়।
  • এরপর এটি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন ‘গল্পগুচ্ছ’-এর তৃতীয় খণ্ডে (১৯২৭) অন্তর্ভুক্ত হয়।
  • ভর্তি পরীক্ষায় পত্রিকার নাম, সম্পাদকের নাম, বঙ্গাব্দ এবং সংখ্যার নাম (কার্তিক সংখ্যা) বারবার জানতে চাওয়া হয়।

Slide 5: গল্পের বয়ান বা বর্ণনারীতি

  • ‘অপরিচিতা’ গল্পটি উত্তম পুরুষের জবানিতে লেখা। অর্থাৎ গল্পের কথক বা বর্ণনাকারী নিজে গল্পটি বলছেন (আমি বা আমার দৃষ্টিকোণ থেকে)।
  • গল্পের নায়ক অনুপম এখানে নিজের জীবনের ঘটে যাওয়া একটি চরম ব্যর্থতা ও মনস্তাপের কথা নিজের মুখেই বর্ণনা করেছে।
  • সে নিজেই নিজের দুর্বলতা, ব্যক্তিত্বহীনতা এবং মেরুদণ্ডহীনতার কথা অকপটে স্বীকার করেছে
  • এটি একটি আত্মকথনমূলক গল্প, যেখানে লেখকের শৈল্পিক বয়ানে সমাজের কুসংস্কারকে তীব্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
  • গল্পের ভাষাভঙ্গি সাধুরীতিতে রচিত।

Slide 6: মূল চরিত্র বিশ্লেষণ: অনুপম - পর্ব ১

  • অনুপম গল্পের কথক এবং নায়ক। গল্প বলার সময় তার বর্তমান বয়স সাতাশ (২৭) বছর। কিন্তু যখন তার বিয়ের কথা চলছিল, তখন তার বয়স ছিল তেইশ (২৩) বছর
  • সে একজন উচ্চশিক্ষিত যুবক, যে সদ্য এম.এ. পাস করেছে। সে দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ এবং সুদর্শন। কিন্তু তার ভেতরে কোনো স্বাধীন সত্তা বা গুণ নেই।
  • ছোটবেলায় পণ্ডিতমশাইরা তার এই সুন্দর কিন্তু গুণহীন চেহারার কারণে তাকে ‘শিমুল ফুল’ এবং ‘মাকাল ফল’-এর সাথে তুলনা করে উপহাস করতেন।
  • শিমুল ফুল দেখতে সুন্দর হলেও তাতে কোনো সুবাস নেই, আর মাকাল ফল বাইরে সুন্দর হলেও ভেতরে দুর্গন্ধযুক্ত ও খাওয়ার অযোগ্য।

Slide 7: মূল চরিত্র বিশ্লেষণ: অনুপম - পর্ব ২

  • অনুপম ছিল তার মামা এবং মায়ের হাতের পুতুল। তার নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না।
  • সে নিজেকে ‘অন্নপূর্ণার কোলে গজাননের ছোট ভাইটি’ (অর্থাৎ মা দুর্গার কোলে থাকা দেব সেনাপতি কার্তিক) হিসেবে ব্যঙ্গার্থে তুলে ধরেছে, যে বড় হয়েও মায়ের কোল ছাড়া হতে পারেনি।
  • সে তামাকটুকু পর্যন্ত খায় না, কারণ খারাপ হওয়ার মতো সাহস বা ঝঞ্ঝাট নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।
  • সে নির্দ্বিধায় বলেছে, “মাতার আদেশ মানিয়া চলিবার ক্ষমতা আমার আছে, বস্তুত না মানিবার ক্ষমতা আমার নাই।”
  • সমাজের চোখে সে একজন ‘সৎপাত্র’ হলেও, আসলে সে একজন ব্যক্তিত্বহীন, পরনির্ভরশীল এবং মেরুদণ্ডহীন পুরুষ

Slide 8: মূল চরিত্র বিশ্লেষণ: কল্যাণী - পর্ব ১

  • কল্যাণী হলো ‘অপরিচিতা’ গল্পের মূল নায়িকা বা অপরিচিতা নারী চরিত্র। বিয়ের সময় কল্যাণীর বয়স ছিল পনেরো (১৫) বছর
  • তৎকালীন সমাজে পনেরো বছর বয়সে অবিবাহিত থাকাটা বেশ অস্বাভাবিক ছিল, যে কারণে অনুপমের মামার মন ভার হয়েছিল।
  • কল্যাণী দেখতে অসম্ভব রূপসী, তার দীপ্তি নির্মল এবং সৌন্দর্যের শুচিতা অপূর্ব। তার চলনে-বলনে কোথাও কোনো জড়তা নেই।
  • অনুপম তাকে কল্পনা করেছিল অনাবৃষ্টির দিনে ফুলের কুঁড়িটির মতো
  • সে ডাক্তার শম্ভুনাথ সেনের একমাত্র কন্যা। তার মাতৃহীন জীবনে বাবাই তার একমাত্র আপনজন।

হিসেব: বিয়ের সময় কল্যাণীর বয়স ছিল ১৫ বছর। যেহেতু গল্পটি বিয়ের ঘটনার চার বছর পর লেখা হচ্ছে (অনুপমের বর্তমান বয়স যখন ২৭), সেহেতু গল্পের বর্তমান সময়ে (অর্থাৎ গল্প বলার সময়) কল্যাণীর বর্তমান বয়স ১৯ বছর

Slide 9: মূল চরিত্র বিশ্লেষণ: কল্যাণী - পর্ব ২

  • কল্যাণী কোনো সাধারণ নারী নয়; সে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদাবোধ এবং স্বাধীনচেতা মানসিকতার এক অনন্য প্রতীক
  • বিয়ের আসরে মামার লোভী আচরণের কারণে যখন বিয়ে ভেঙে যায়, তখন সে কান্নায় ভেঙে পড়েনি। বরং সে নিজের জীবনকে নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়
  • সে আজীবন অবিবাহিত থাকার কঠিন প্রতিজ্ঞা করে এবং নারী শিক্ষার ব্রত গ্রহণ করে।
  • সে অনুপমকে জানিয়ে দেয় যে সে আর বিয়ে করবে না, কারণ তার ‘মাতৃ-আজ্ঞা’ বা দেশমাতার সেবা করার দায়িত্ব রয়েছে।
  • ট্রেনের ভেতর ইংরেজ জেনারেলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী রূপ প্রমাণ করে সে কতটা তেজস্বী

মূল সুর: কল্যাণীর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার 'স্বতন্ত্র বীক্ষা' বা নিজস্ব স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তৎকালীন সমাজের গতানুগতিক নারীদের মতো সে মুখ বুজে সব মেনে নেয়নি; বরং তার এই স্বতন্ত্র মানসিকতাই তাকে প্রতিবাদী করে তুলেছে।

Slide 10: গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র: শম্ভুনাথ সেন

  • শম্ভুনাথ সেন কল্যাণীর বাবা এবং পেশায় কানপুরের একজন ডাক্তার। তার বয়স চল্লিশের কিছু এপার-ওপার
  • তার মাথার চুল কাঁচা এবং গোঁফে সবেমাত্র পাক ধরতে শুরু করেছে। তিনি দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ, ভিড়ের মধ্যে তার দিকেই সবার আগে চোখ পড়ে।
  • তিনি অত্যন্ত শান্ত, বিনয়ী, নিরেট ভদ্রলোক কিন্তু তার ভেতরে প্রখর আত্মসম্মানবোধ ও দৃঢ়তা লুকিয়ে আছে। তিনি কম কথা বলেন।
  • যৌতুকলোভী মামা যখন বিয়ের আসরে গহনা মাপার মতো জঘন্য কাজ করে, তখন তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বরপক্ষকে খাইয়ে দিয়ে অত্যন্ত ভদ্রভাবে অথচ দৃঢ়তার সাথে বিয়ে ভেঙে দেন

Slide 11: গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র: অনুপমের মামা

  • অনুপমের মামা হলো গল্পের প্রধান খলচরিত্র এবং অনুপমের ভাগ্যদেবতার প্রধান এজেন্ট। বয়সে সে অনুপমের চেয়ে বড়জোর ছয় বছরের বড় (বয়স ৩৩ বছর)
  • কিন্তু সে অনুপমদের পুরো সংসারটাকে ‘ফল্গু নদীর বালির মতো’ নিজের অন্তরের মধ্যে শুষে নিয়েছে।
  • মামা অত্যন্ত লোভী এবং ধড়িবাজ। সে চায় এমন এক বেয়াই যার টাকা নেই, কিন্তু যৌতুক দিতে কোনো কার্পণ্য করবে না, যাকে আজীবন শোষণ করা যাবে।
  • মামা কলকাতাকেই পৃথিবীর সব মনে করে, সে কখনোই কলকাতার বাইরে যায়নি; তার কাছে বাইরের পৃথিবীটা ‘আন্দামান দ্বীপ’-এর মতো।
  • সে সুযোগ পেলে মনুসংহিতায় হাবড়ার পোল পার হওয়া নিষেধ করে দিত।

তাত্পর্য: মামার যৌতুকলোভী ও শোষক মানসিকতা বোঝাতে গল্পে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি ব্যবহৃত হয়েছে— “বেয়াই সম্প্রদায়ের আর যাই থাক, তেজ থাকাটা দোষের।” তিনি এমন বেয়াই খুঁজছিলেন যাকে শোষণ করা চলবে এবং সাধারণ 'বাঁধা হুঁকা' দিলেও যিনি কোনো নালিশ করবেন না।

Slide 12: অন্যান্য চরিত্র: অনুপমের মা ও হরিশ

  • অনুপমের মা গরিব ঘরের মেয়ে ছিলেন। অনুপমের বাবা ওকালতি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করার পর মা তাদের এই ধনের অহংকার কখনো ভুলতে পারেন না এবং অনুপমকেও ভুলতে দেন না। অনুপম মায়ের হাতেই মানুষ হয়েছে।
  • অন্যদিকে হরিশ হলো অনুপমের বন্ধু, যে কানপুরে কাজ করে
  • সে খুবই রসিক মানুষ এবং ‘আসর জমাইতে অদ্বিতীয়’
  • হরিশই মূলত কানপুরে কল্যাণীকে দেখে এসে অনুপমকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং তার সরস বর্ণনায় অনুপমের মন বসন্ত বাতাসের বকুল বনের নবপল্লব রাশির মতো কেঁপে ওঠে।

Slide 13: অন্যান্য চরিত্র: বিনু দাদা ও উকিল বন্ধু

  • বিনু দাদা হলো অনুপমের পিসতুতো ভাই। কল্যাণীকে আশীর্বাদ করার জন্য তাকেই কানপুরে পাঠানো হয়েছিল।
  • বিনু দাদার রুচি ও দক্ষতার ওপর অনুপম ষোলো আনা (শতভাগ) নির্ভর করে
  • বিনু দাদার ভাষা অত্যন্ত আঁটসাট; যেখানে মানুষ বলে চমৎকার, সেখানে বিনু দাদা বলে ‘চলনসই’। সেই বিনু দাদা কল্যাণীকে দেখে এসে বলেছিল, “মন্দ নয় হে! খাঁটি সোনা বটে।”
  • গল্পে শম্ভুনাথ বাবুর একজন উকিল বন্ধুর কথাও আছে। তিনি ছিলেন মোটা, টাকপড়া এবং মিশকালো। বিয়ের আসরে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বরযাত্রীদের আপ্যায়ন করেছিলেন।

উকিল বন্ধু: শম্ভুনাথ বাবুর উকিল বন্ধুর শারীরিক বর্ণনার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র রয়েছে— তাঁর কোমরে চাদর বাঁধা, গলা ভাঙা, মাথায় টাক পড়া, গায়ের রং মিশকালো এবং বিপুল শরীর। তিনি অত্যন্ত নম্রতার সাথে গদগদ বচনে বরযাত্রীদের আপ্যায়ন করেছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ম্যাট্রিক্স

১. চরিত্রগুলোর বয়সের ডেটা ম্যাট্রিক্স

চরিত্রের নাম বিয়ের সময়ের বয়স বর্তমান বয়স (গল্প বলার সময়) মনে রাখার শর্টকাট কৌশল
অনুপম২৩ বছর২৭ বছরবর্তমান বয়স থেকে বিয়ের সময়ের পার্থক্য ৪ বছর।
কল্যাণী১৫ বছর১৯ বছর১৫ + ৪ = ১৯ বছর (গল্পের বর্তমান সময়ে)।
মামা২৯ বছর৩৩ বছরঅনুপমের চেয়ে ঠিক ৬ বছরের বড় (২৭ + ৬ = ৩৩)।
শম্ভুনাথ সেনপ্রযোজ্য নয়চল্লিশের কিছু এপার-ওপারচুলে কাঁচা-পাক ধরেছে, এমন পরিণত বয়স।

২. প্রকাশকাল ও পত্রিকার ডেটা ম্যাট্রিক্স

বিষয় সুনির্দিষ্ট তথ্য
পত্রিকার নামসবুজপত্র
পত্রিকার সম্পাদকপ্রমথ চৌধুরী
বঙ্গাব্দ ও সংখ্যা১৩২১ বঙ্গাব্দ, কার্তিক সংখ্যা
খ্রিস্টাব্দ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ
প্রথম গ্রন্থভুক্তিগল্পসপ্তক
চূড়ান্ত সংকলনগল্পগুচ্ছ (তৃতীয় খণ্ড)

৩. গুরুত্বপূর্ণ উপমা ও রূপকের ডেটা ম্যাট্রিক্স

এই অংশটি থেকে ভর্তি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে, তাই এটি ছক আকারে মনে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ:

উপমা / রূপক যার বা যে ঘটনার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত অন্তর্নিহিত অর্থ বা তাৎপর্য
মাকাল ফল ও শিমুল ফুলঅনুপমের বাহ্যিক সৌন্দর্যবাইরে থেকে দেখতে সুন্দর হলেও ভেতরে গুণহীন বা অসার।
গজাননের ছোট ভাইঅনুপমের পরনির্ভরশীলতামা দুর্গার কোলে আশ্রিত কার্তিকের মতো, যার নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নেই।
ফল্গু নদীমামার শোষক চরিত্রবালির নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদীর মতো, যে সংসারকে নীরবে শুষে নিয়েছে।
আন্দামান দ্বীপকলকাতার বাইরের জগতমামার কুপমণ্ডূকতা এবং বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে অজ্ঞতা।
পদ্মবন দলিত-বিদলিত করাবরযাত্রীদের কোলাহলমত্ত হাতির মতো শান্ত ও সুন্দর বিবাহ আসরের পরিবেশ নষ্ট করা।
দক্ষযজ্ঞবরযাত্রীদের ভাঙচুরঅপমানিত হয়ে ফিরে আসার সময় বরপক্ষের ক্ষোভ ও ধ্বংসাত্মক আচরণ।
মরীচিকানারীরূপের মোহঅনুপমের বেকার জীবনে অলীক বা কাল্পনিক প্রেমের তৃষ্ণা।

Slide 14: গল্পের সূচনা ও অনুপমের অতীত

  • গল্পের শুরুতেই অনুপম নিজের জীবনের তুচ্ছতার কথা বর্ণনা করে। সে জানায় যে তার জীবন দৈর্ঘ্যের দিক থেকেও বড় নয়, গুণের দিক থেকেও বড় নয়।
  • তবুও এর একটি বিশেষ মূল্য আছে, কারণ তার জীবনে একটি বসন্তের হাওয়া এসেছিল
  • তার বাবা প্রচুর টাকা রোজগার করলেও তা ভোগ করে যেতে পারেননি। উপার্জনে ব্যস্ত বাবার জীবনে প্রথম ছুটি বা অবকাশ ছিল তাঁর মৃত্যু
  • অনুপম ছোটবেলা থেকে মা ও মামার আশ্রয়ে এতটাই আবদ্ধ ছিল যে বাইরের জগতের কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতাই তার হয়নি।

Slide 15: বিবাহ প্রস্তাব ও পাত্রী সন্ধান

  • অনুপম এম.এ. পাস করার পর অখণ্ড অবসরে ছিল। তার তখন পরীক্ষা নেই, চাকরির চেষ্টা নেই
  • সে সময় হরিশ কানপুর থেকে এসে জানায়, “মেয়ে যদি বল, একটি খাসা মেয়ে আছে।”
  • হরিশের এই কথায় অনুপমের মনে বিশ্বব্যাপী নারীরূপের মরীচিকা দেখা দেয়।
  • মামা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, মেয়ের বাবা পশ্চিমে থাকেন, এককালে ধনী থাকলেও এখন তাদের অবস্থা তেমন ভালো নয়। তবে একটাই মেয়ে হওয়ায় মেয়ের পেছনে নিজের সব সম্পত্তি উপুড় করে দিতে তিনি দ্বিধা করবেন না
  • মামার কাছে এটিই সবচেয়ে আদর্শ সম্বন্ধ মনে হয়।

নোট: বন্ধু হরিশের একটি বিশেষ গুণ ছিল, তার 'সরস রসনার গুণ' (রস দিয়ে কথা বলার ক্ষমতা) ছিল। সে কল্যাণীকে 'খাসা মেয়ে' (অত্যন্ত চমৎকার বা নিখুঁত মেয়ে) হিসেবে অনুপমের কাছে উপস্থাপন করেছিল।

Slide 16: পণপ্রথা ও বিয়ের আসর

  • বিয়ের দেনাপাওনা নিয়ে মামা অত্যন্ত চতুরতার সাথে পাকাপাকি কথা সেরে ফেলেন
  • গায়ে হলুদের দিন অনুপমদের পক্ষ থেকে এত বাহক পাঠানো হয় যে তাদের আদমশুমারি করতে কেরানি রাখতে হবে
  • বিয়ের দিন কনসার্ট, ব্যান্ড, বাঁশি বাজিয়ে, বর্বর কোলাহলের মত্ত হস্তীর মতো সংগীত সরস্বতীর পদ্মবন দলিত-বিদলিত করে বরপক্ষ বিয়েবাড়িতে পৌঁছায়।
  • অনুপমকে সেদিন এত গহনা পরানো হয়েছিল যেন সে নিলামে চড়া কোনো গহনার দোকান
  • কিন্তু বিয়েবাড়ির সাদামাটা আয়োজন দেখে মামা খুশি হতে পারলেন না

Slide 17: গহনা যাচাইয়ের চরম অপমান

  • মামার জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল তিনি কারো কাছে ঠকবেন না। তাই বিয়ের আগে কনের গহনা মেপে দেখার জন্য তিনি সাথে করে একজন ‘শ্যাকরা’ (স্বর্ণকার), কষ্টিপাথর এবং দাঁড়িপাল্লা নিয়ে আসেন।
  • শম্ভুনাথ সেন অনুপমকে জিজ্ঞেস করেন, এতে তার কোনো মত আছে কি না। কিন্তু মেরুদণ্ডহীন অনুপম মাথা নিচু করে চুপ থাকে
  • শম্ভুনাথ সেন পিতামহীদের আমলের খাঁটি গহনা এনে দেখান। মকরমুখা বালাটিতে চাপ দিলে তা বেঁকে যায়, কারণ সেটি সম্পূর্ণ খাঁটি সোনা।
  • কিন্তু অনুপমদের দেওয়া আশীর্বাদের ‘ইয়ারিং’টি পরীক্ষা করে শ্যাকরা জানায়, এতে সোনার ভাগ খুবই সামান্য

Slide 18: বিবাহভঙ্গ ও শম্ভুনাথ সেনের আত্মমর্যাদা

  • আশীর্বাদের ইয়ারিংয়ে খাদ প্রমাণিত হওয়ায় মামা চরম অপমানিত হন
  • এই ঘটনার পর শম্ভুনাথ সেন অত্যন্ত শান্তভাবে বরপক্ষকে আগে খাইয়ে দেন। এরপর মামাকে বলেন, গাড়ি ডেকে দিচ্ছি, আপনারা এবার আসুন
  • মামা অবাক হয়ে বলেন, লগ্ন তো পার হয়ে যাচ্ছে। শম্ভুনাথ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন, “ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করিবার ইচ্ছা আমার নাই। আমার কন্যার গহনা আমি চুরি করিব এ কথা যারা মনে করে তাদের হাতে আমি কন্যা দিতে পারি না।”
  • এই অপমানে বরযাত্রীরা দক্ষযজ্ঞের পালা সেরে ফিরে আসে

Slide 19: বিবাহভঙ্গের পর অনুপমের মানসিক অবস্থা

  • বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর মামা মানহানির মামলা করতে চেয়েও পরে থেমে যান। অন্যদিকে অনুপমের মন কেবল সেই অপরিচিতার দিকেই ছুটে যায়
  • সে কল্পনায় দেখতে থাকে, কল্যাণী হয়তো চুল বাঁধতে ভুলে গেছে, তার দুই চোখ জলে ভরা। সে ভাবে শম্ভুনাথ বাবু হয়তো ক্ষমা চাইতে আসবেন। কিন্তু এগুলো ছিল শুধুই তার আকাশকুসুম কল্পনা।
  • বাস্তবে কল্যাণী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নারীদের শিক্ষিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিল
  • অনুপমের মন বিবাহসভার দেয়ালের বাইরে ভূতের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেড়াতে থাকে

রূপক: এই সময়ে বেকার ও কর্মহীন অনুপম তার নিজের অবস্থাকে 'অবকাশের মরুভূমি' (দীর্ঘ কর্মহীন ও আনন্দহীন সময়) এবং সেই সময়ে নারীরূপের মোহকে মরুভূমির 'মরীচিকা'-এর সাথে তুলনা করেছে।

Slide 20: রেলগাড়ির ভ্রমণ ও সেই সুধাময় কণ্ঠ

  • প্রায় এক বছর পর মাকে নিয়ে তীর্থে যাওয়ার পথে রেলগাড়িতে অনুপমের জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
  • রাতের অন্ধকারে একটা স্টেশনে হঠাৎ সে একটি বাঙালি মেয়ের কণ্ঠে শুনতে পায়, “শিগগির চলে আয়, এই গাড়িতে জায়গা আছে।”
  • এই কণ্ঠস্বর শুনে অনুপমের মনে হয় যেন সে কোনো ঐশ্বরিক গান শুনল। তার কাছে চিরকাল গলার স্বরই বড় সত্য ছিল।
  • মানুষের অন্তরতম ও অনির্বচনীয় রূপটিই যেন তার কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠস্বর অনুপমের হৃদয়ে চিরকালের জন্য গেঁথে যায়।

উক্তি: "মানুষের মধ্যে যাহা অন্তরতম ও অনির্বচনীয়, কণ্ঠস্বর যেন তারই চেহারা।" এছাড়া, "জায়গা আছে" এই সুধাময় কথাটিকে অনুপম তার চিরজীবনের 'গানের ধুয়া' (গানের যে অংশ বারবার গীত হয় বা ফিরে আসে) হিসেবে গ্রহণ করেছিল।

Slide 21: রেলগাড়ির ঘটনা ও নারীশক্তির উন্মেষ

  • পরদিন সকালে গাড়ি বদল করার সময় ফার্স্ট ক্লাসে জায়গা না পেয়ে যখন অনুপম ও তার মা হয়রান, তখন সেকেন্ড ক্লাস থেকে সেই মেয়েটিই তাদের ডেকে জায়গা দেয়
  • স্টেশনে ইংরেজ জেনারেল সাহেবের দল যখন তাদের কামরাটি দখল করতে চায়, তখন কল্যাণী রুখে দাঁড়ায়
  • সে ভয়হীনভাবে ইংরেজ স্টেশন মাস্টারকে টিকিট ছুড়ে দিয়ে বলে যে, গাড়ি আগে থেকে রিজার্ভ করা এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
  • কল্যাণীর এই সাহসিকতা, চোখের অগ্নিবর্ষণ এবং চলিষ্ণুতার অভাব দেখে স্টেশন মাস্টার ও ইংরেজ জেনারেল পিছু হটতে বাধ্য হয়।

Slide 22: পরিচয় উদ্ঘাটন ও কানপুর যাত্রা

  • ট্রেনটি যখন কানপুরে এসে পৌঁছায়, তখন নামার আগে অনুপমের মা মেয়েটির পরিচয় জানতে চান।
  • মেয়েটি জানায় তার নাম কল্যাণী এবং তার বাবা কানপুরের ডাক্তার শম্ভুনাথ সেন
  • এই পরিচয় পেয়ে অনুপম ও তার মা চমকে ওঠেন
  • এতদিন পর সেই হারানো রত্নকে নিজের চোখের সামনে দেখে অনুপমের ভেতরে যেন এক নতুন শক্তির সঞ্চার হয়
  • সে এবার মামার নিষেধ এবং মায়ের আজ্ঞা উপেক্ষা করে সোজা কানপুরে চলে যায় এবং শম্ভুনাথ বাবুর কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চায়।

Slide 23: কল্যাণীর ব্রত ও মাতৃ-আজ্ঞা

  • কানপুরে গিয়ে শম্ভুনাথ বাবুর মন গলাতে পারলেও কল্যাণীকে টলানো সম্ভব হয়নি
  • কল্যাণী স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে সে আর বিবাহ করবে না
  • কারণ জানতে চাইলে সে বলে, তার ‘মাতৃ-আজ্ঞা’ রয়েছে।
  • অনুপম প্রথমে ভেবেছিল মামার মতো এখানে কোনো মায়ের বাধা আছে। কিন্তু পরে বুঝতে পারে, এই মাতৃ-আজ্ঞা বলতে কল্যাণী দেশমাতৃকা বা মাতৃভূমির প্রতি তার দায়বদ্ধতাকে বুঝিয়েছে
  • নারী শিক্ষার ব্রত গ্রহণ করে কল্যাণী নিজের জীবনকে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে উৎসর্গ করেছে।

Slide 24: গল্পের সমাপ্তি ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

  • গল্পের শেষে দেখা যায় অনুপমের বয়স এখন সাতাশ বছর। সে বিবাহের আশা ছেড়ে দিয়ে কানপুরেই থেকে গেছে
  • সে কল্যাণীর কাছাকাছি থেকে তার কাজে সাহায্য করে এবং এতেই সে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়।
  • সে মনে মনে বলে, “ভাগ্য আমার ভালো, এই তো আমি জায়গা পাইয়াছি।”
  • এই গল্পটি কেবল একটি প্রেমকাহিনি নয়, বরং এটি পুরুষতন্ত্রের অমানবিকতার বিরুদ্ধে এবং যৌতুক প্রথার নির্মমতার বিরুদ্ধে এক বিশাল চপেটাঘাত
  • কল্যাণীর এই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব তৎকালীন সমাজে নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Slide 25: গুরুত্বপূর্ণ রূপক, উপমা ও সমাস - ১

  • ভর্তি পরীক্ষার জন্য গল্পের ভেতরের রূপক ও সমাস জানা অপরিহার্য।
  • অন্নপূর্ণা: অন্নে পূর্ণা যে (উপপদ তৎপুরুষ সমাস)। দেবী দুর্গার অপর নাম।
  • গজানন: গজ আনন যার (বহুব্রীহি সমাস)। এর অর্থ গণেশ।
  • পঞ্চশর: পঞ্চ শর যার (বহুব্রীহি সমাস)। প্রেমের দেবতা মদনদেবকে বোঝানো হয়েছে।
  • প্রজাপতি: বিয়ের দেবতা বা ব্রহ্মা।
  • ফল্গু নদী: ভারতের গয়া অঞ্চলের একটি অন্তঃসলিলা নদী (যার নিচে পানি, ওপরে বালি)। মামার শোষণকারী চরিত্র বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

টীকা: ফল্গু নদী: এটি ভারতের গয়া অঞ্চলে অবস্থিত একটি নদী, যার রূপক দিয়ে মামার শোষণকারী চরিত্র বোঝানো হয়েছে। পঞ্চশর ও প্রজাপতি: 'পঞ্চশর' বলতে সুনির্দিষ্টভাবে প্রেমের দেবতা মদনদেব-কে এবং 'প্রজাপতি' বলতে বিবাহের দেবতা ব্রহ্মা-কে বোঝানো হয়েছে। এই দুই দেবতার মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না বলেই অনুপম ভেবেছিল তার বিয়ে সুনিশ্চিত।

Slide 26: গুরুত্বপূর্ণ রূপক, উপমা ও সমাস - ২

  • মাকাল ফল ও শিমুল ফুল: দেখতে সুন্দর কিন্তু ভেতরে গুণহীন বা অসার। অনুপমের রূপ বোঝাতে ব্যবহৃত।
  • সংগীত সরস্বতীর পদ্মবন: সরস্বতী বিদ্যার দেবী। শান্ত ও সুন্দর বিবাহ আসরকে বোঝানো হয়েছে, যা বরযাত্রীরা মত্ত হস্তীর মতো ধ্বংস করেছিল।
  • দক্ষযজ্ঞ: প্রজাপতি দক্ষ কর্তৃক আয়োজিত যজ্ঞ, যা শিব এসে ধ্বংস করেছিলেন। বরযাত্রীদের ভাঙচুর বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
  • মরীচিকা: মরুভূমির বুকে আলোর প্রতিফলনে সৃষ্ট বিভ্রম। অনুপমের বেকার জীবনে নারীরূপের অলীক কল্পনা বোঝাতে এটি ব্যবহৃত।
  • কলি যে চার পোয়া হইয়া আসিল: হিন্দু পুরাণের চার যুগের শেষ যুগ হলো কলিযুগ (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি)। চরম অবক্ষয় বা ধ্বংসের সময় বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। বরযাত্রীরা অপমানিত হয়ে ফিরে আসার সময় তাদের মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব নিয়ম যেন উল্টে যাচ্ছে।
  • মহানির্বাণ লাভ: ফিরে আসার সময় বরযাত্রীদের আলো বা অভ্রের ঝাড়গুলো যে নিভে গিয়েছিল, সেটিকে ব্যঙ্গ করে লেখক বলেছেন তারা যেন আকাশের তারার ওপর দায়িত্ব দিয়ে অনন্তকালের জন্য মুক্তি বা 'মহানির্বাণ' লাভ করেছে।

Slide 27: গল্পে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য শব্দার্থ ও টীকা

  • উমেদারি: চাকরির আশায় অন্যের কাছে ধর্না দেওয়া।
  • গড়গুড়ি ও বাঁধা হুঁকা: গড়গুড়ি হলো অভিজাতদের ধূমপানের যন্ত্র (প্রিমিয়াম), আর বাঁধা হুঁকা হলো নারকেলের খোলে তৈরি সাধারণ ধূমপান যন্ত্র।
  • শ্যাকরা: যে স্বর্ণকারের কাজ করে বা সোনা যাচাই করে।
  • মকরমুখা: মকর বা কুমিরের মুখের মতো নকশা করা মোটা বালা।
  • অরগ্যান্ডি: এক প্রকার মিহি সুতি কাপড়।
  • একচক্ষু লণ্ঠন: ট্রেনের গার্ডের হাতে থাকা আলো, যার এক দিক খোলা ও তিন দিক ঢাকা থাকে।
  • মনুসংহিতা: প্রাচীন সমাজবিধায়ক 'মনু' রচিত সমাজ ও আচরণবিধি সংক্রান্ত গ্রন্থ। মামা মনু হলে এই গ্রন্থে হাবড়ার পোল পার হওয়া নিষেধ করে দিতেন।
  • আরদালি: এটি মূলত ইংরেজি 'Orderly' শব্দ থেকে আগত, যার অর্থ চাপরাশি বা অনুচর (স্টেশনে জেনারেল সাহেবের সাথে এই আরদালির দল ছিল)।
  • স্বয়ংবরা: যে নারী নিজের স্বামী নিজেই নির্বাচন করে।
  • সওগাত: উপঢৌকন বা উপহার।
  • মহার্ঘ: মহামূল্যবান বা অত্যন্ত দামি (তৎকালীন সমাজে যোগ্য বরের অভাব বোঝাতে 'বরের হাট মহার্ঘ' বলা হয়েছে)।

ভর্তি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি এক-লাইনার তথ্য

এই বৈজ্ঞানিক কৌশলটির একটি ছোট নির্দেশিকা। যেমন: "প্রথম রিভিশন: পড়ার ১ দিন পর। দ্বিতীয় রিভিশন: ৩ দিন পর। তৃতীয় রিভিশন: ৭ দিন পর। কঠিন বা কনফিউজিং সাল/সংখ্যাগুলো ফ্ল্যাশকার্ডে লিখে বারবার দেখা।"

১. 'অপরিচিতা' গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত 'সবুজপত্র' পত্রিকায়।
২. গল্পটি ১৩২১ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায় (১৯১৪ খ্রি.) প্রকাশিত হয়।
৩. গল্পটি প্রথম গ্রন্থভুক্ত হয় 'গল্পসপ্তক' গ্রন্থে এবং পরে 'গল্পগুচ্ছ' তৃতীয় খণ্ডে
৪. গল্পটি উত্তম পুরুষের জবানিতে (First-person narrative) রচিত।
৫. গল্পের নায়ক অনুপমের বর্তমান বয়স সাতাশ বছর এবং বিয়ের সময় বয়স ছিল তেইশ বছর
৬. অনুপমের বাবার পেশা ছিল ওকালতি
৭. অনুপমের বাবার জীবনের প্রথম অবকাশ বা ছুটি ছিল তাঁর মৃত্যু
৮. অনুপমকে পণ্ডিতমশাই শিমুল ফুল ও মাকাল ফলের সাথে তুলনা করতেন।
৯. অনুপম নিজেকে অন্নপূর্ণার কোলে গজাননের ছোট ভাই (কার্তিক) হিসেবে ব্যঙ্গ করেছে।
১০. অনুপমের আসল অভিভাবক তার মামা, যে অনুপমের চেয়ে বড়জোর ছয় বছরের বড় (৩৩ বছর)।
১১. মামা অনুপমদের সংসারটিকে ফল্গু নদীর বালির মতো শুষে নিয়েছেন।
১২. মামা এমন বেয়াই চান যার টাকা নেই অথচ টাকা দিতে কসুর করবে না
১৩. মামার কাছে কলকাতার বাইরের পৃথিবীটা আন্দামান দ্বীপের মতো
১৪. মামা জীবনে একবার বিশেষ কাজে কোন্নগর পর্যন্ত গিয়েছিলেন।
১৫. মামা মনু হলে মনুসংহিতায় হাবড়ার পোল পার হওয়া নিষেধ করে দিতেন।
১৬. অনুপমের বন্ধু হরিশ কাজ করে কানপুরে
১৭. আসর জমাতে অদ্বিতীয় এবং রসিক মানুষ হলো হরিশ
১৮. বিয়ের সময় কল্যাণীর বয়স ছিল পনেরো বছর
১৯. বরের হাট মহার্ঘ এবং পন হলো ধনুক ভাঙা
২০. কন্যাকে আশীর্বাদ করতে কানপুরে পাঠানো হয় অনুপমের পিসতুতো ভাই বিনু দাদাকে
২১. বিনু দাদার ভাষা অত্যন্ত আঁট, তিনি ‘চমৎকার’ না বলে বলেন ‘চলনসই’
২২. বিনু দাদা কল্যাণীকে দেখে এসে বলেছিল, “মন্দ নয় হে! খাঁটি সোনা বটে।”
২৩. অনুপম বিনু দাদার রুচি ও দক্ষতার ওপর ষোলো আনা নির্ভর করে।
২৪. অনুপমের ভাগ্যে প্রজাপতির (বিয়ের দেবতা) সাথে পঞ্চশরের (প্রেমের দেবতা) কোনো বিরোধ নেই।
২৫. কল্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ সেন পেশায় একজন ডাক্তার
২৬. শম্ভুনাথ সেনের বয়স চল্লিশের কিছু এপার-ওপার
২৭. শম্ভুনাথ সেনের এক উকিল বন্ধুর গলা ভাঙা, টাকপড়া এবং তিনি মিশকালো
২৮. মামা বিয়েবাড়িতে এসে কনের গহনা মাপার জন্য সাথে নিয়ে আসেন শ্যাকরা, দাঁড়িপাল্লা ও কষ্টিপাথর
২৯. কল্যাণীর সমস্ত গহনা ছিল পিতামহীদের আমলের, মোটা ও ভারী
৩০. মকরমুখা বালাটিতে শ্যাকরা চাপ দিলে তা খাঁটি সোনা হওয়ায় বেঁকে যায়।
৩১. আশীর্বাদের ইয়ারিং বা কানের দুলটি ছিল বিলাতি মাল, যাতে সোনার ভাগ সামান্যই ছিল।
৩২. শম্ভুনাথ সেন বরপক্ষকে খাইয়ে দিয়ে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বিয়ে ভেঙে দেন
৩৩. শম্ভুনাথ সেন বলেন, “ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করিবার ইচ্ছা আমার নাই।”
৩৪. বরযাত্রীরা ফেরার সময় রাগে দক্ষযজ্ঞের পালা সেরে বা ভাঙচুর করে ফিরে আসে।
৩৫. অনুপমের মন অবকাশের মরুভূমিতে নারীরূপের মরীচিকা দেখছিল।
৩৬. অনুপম রেলগাড়িতে মাঝরাতে একটি সুধাময় কণ্ঠ শুনতে পায়, “শিগগির চলে আয়, এই গাড়িতে জায়গা আছে।”
৩৭. অনুপমের চিরকালের গানের ধোঁয়া হয়ে দাঁড়ায় “জায়গা আছে” কথাটি।
৩৮. অনুপমের কাছে রূপের চেয়ে চিরকাল গলার স্বরই বড় সত্য
৩৯. রেলগাড়ির চাকায় লোহার মৃদঙ্গে তাল বাজছিল
৪০. পরের দিন সকালে সেকেন্ড ক্লাসের গাড়ি থেকে কল্যাণী অনুপমদের তাদের কামরায় ডাকে।
৪১. তাড়াহুড়োয় ট্রেনে ওঠার সময় অনুপম তার ফটোগ্রাফ তুলিবার ক্যামেরাটি স্টেশনে ফেলে আসে।
৪২. কল্যাণীকে প্রথম দেখার পর অনুপম তার বয়স ১৬ কি ১৭ বছর বলে অনুমান করে।
৪৩. কল্যাণীর সৌন্দর্যের শুচিতা অপূর্ব এবং গতি ছিল সহজ ও নির্মল
৪৪. স্টেশনে খাবারওয়ালার কাছ থেকে কল্যাণী এক পত্তন চানা-মুঠ কিনেছিল।
৪৫. ইংরেজ স্টেশন মাস্টার এবং জেনারেলের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কল্যাণী টিকিট প্ল্যাটফর্মে ছুড়ে ফেলেছিল
৪৬. কল্যাণী স্টেশন মাস্টারের সাথে ইংরেজিতে এবং রেলওয়ের দেশি কর্মচারীর সাথে হিন্দিতে কথা বলেছিল।
৪৭. মামার নিষেধ অমান্য করে অনুপম কানপুরে শম্ভুনাথ সেনের কাছে ছুটে যায়
৪৮. কল্যাণী পুনরায় বিবাহ না করার কারণ হিসেবে ‘মাতৃ-আজ্ঞা’র কথা উল্লেখ করে
৪৯. মাতৃ-আজ্ঞা বলতে এখানে মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নারী শিক্ষার ব্রতকে বোঝানো হয়েছে।
৫০. গল্পের শেষে অনুপম কানপুরেই অবস্থান করে এবং কল্যাণীর সান্নিধ্য পেয়েই মনে করে “এই তো জায়গা পাইয়াছি।”

MCQ 'Reverse Engineering' ও 'Active Recall' কৌশল

প্রশ্ন সমাধানের কৌশল: "প্রশ্নে যদি অপরিচিতা গল্পের পত্রিকার নাম জানতে চায় এবং অপশনে 'বঙ্গদর্শন' বা 'ভারতী' থাকে, তবে সাল ও সম্পাদকের নাম লজিক্যালি চিন্তা করে সেগুলো প্রথমেই বাতিল (Eliminate) করতে হবে, কারণ সেগুলো অন্য ঘরানার বা ভিন্ন সময়ের।"

এই সুবিন্যস্ত পাঠ্য নির্দেশিকাটি বারবার অধ্যয়ন করলে ভর্তি পরীক্ষায় ‘অপরিচিতা’ গল্প সম্পর্কিত যেকোনো বহুনির্বাচনি প্রশ্নের উত্তর তুমি নিশ্চিতভাবে সঠিকভাবে দিতে পারবে। তোমার সফলতার জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা!