বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন - লেকচারশীট
Full Page Thumbnail

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আলোচ্য বিষয়ের সূচিপত্র (Step-by-step Topic Table)
ধাপসমূহ আলোচ্য বিষয়
ধাপ ১সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন, কর্ম ও সাহিত্যিক অবদানের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ।
ধাপ ২'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধের উৎস, প্রকাশনা এবং অন্তর্নিহিত মূলভাব।
ধাপ ৩সাহিত্য রচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং নবীন লেখকদের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রদান করা তেরোটি (১৩টি) অমূল্য নির্দেশনার গভীর বিশ্লেষণ।
ধাপ ৪সাময়িক সাহিত্য, লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি, এবং অলংকার প্রয়োগের বিধিনিষেধ সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনা।
ধাপ ৫প্রবন্ধে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ এবং টীকা বিশ্লেষণ।
ধাপ ৬ভর্তি পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি এককথায় প্রকাশ (One-Liner Data)।
১: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
  • বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
  • তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই জন্ম বাংলা সাহিত্যের জন্য এক নবজাগরণের বার্তা নিয়ে এসেছিল।
  • তাঁর পিতার নাম ছিল যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যিনি পেশায় একজন অত্যন্ত স্বনামধন্য ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন।
  • পিতার এই প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রভাব বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যিক জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।
  • একটি সম্ভ্রান্ত ও সুশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করার সুবাদে তিনি বাল্যকাল থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
  • তাঁর এই পারিবারিক পটভূমিই পরবর্তীতে তাঁকে সমাজ বাস্তবতার এক নিপুণ পর্যবেক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল।
  • 'বঙ্কিমচন্দ্র' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো 'বাঁকা চাঁদ'
  • তাঁর একজন জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন, যাঁর নাম সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের চার বছর পূর্বে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
  • সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনিমূলক গ্রন্থের নাম 'পালামৌ'
  • এই গ্রন্থেই তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম একটি উক্তি করেছেন—"বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে"
২: শিক্ষাজীবন ও পেশাগত সাফল্য
  • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য এবং সাফল্যমণ্ডিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থী।
  • ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে যখন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রথম স্নাতক (বিএ) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, বঙ্কিমচন্দ্র সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম স্নাতকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
  • তাঁর এই অসামান্য শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁকে পেশাগত জীবনেও সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দেয়।
  • পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দাপুটে ও ন্যায়পরায়ণ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডেপুটি কালেক্টর
  • চাকরিসূত্রে তিনি খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নীলকরদের অমানবিক অত্যাচার কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন।
  • দায়িত্ব পালনে তাঁর এই নিষ্ঠা এবং যোগ্য বিচারক হিসেবে তাঁর প্রখর খ্যাতি তৎকালীন সমাজে তাঁকে এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল।
৩: সাহিত্যচর্চার সূচনা ও সাহিত্যসম্রাট উপাধি
  • প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যচর্চায় যে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন, তা আজও তুলনাহীন।
  • ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত স্বনামধন্য 'সম্বাদ প্রভাকর' পত্রিকায় একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুভ সূচনা ঘটে।
  • শুরুতে তিনি ছদ্মনামেও লেখালেখি করতেন; তাঁর সর্বাধিক পরিচিত ছদ্মনামটি হলো 'কমলাকান্ত'
  • বাংলা সাহিত্যে তাঁর অপরিসীম ও যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে 'সাহিত্যসম্রাট' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
  • তিনি বাংলা গদ্যের যে সুদৃঢ় ও পরিশীলিত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যকে একটি আধুনিক ও বৈশ্বিক রূপ দান করেছিল।
  • তাঁর লেখনীর এই প্রখরতার জন্যই তাঁকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪: বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস সমগ্র ও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
  • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মোট রচিত গ্রন্থের সংখ্যা হলো চৌত্রিশটি (৩৪টি)
  • বাংলা ভাষায় প্রথম শিল্পসম্মত ও সার্থক উপন্যাস রচনার একক কৃতিত্ব সম্পূর্ণভাবে তাঁরই।
  • ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর 'দুর্গেশনন্দিনী' উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
  • এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম রোমান্টিক উপন্যাস 'কপালকুণ্ডলা'
  • তাঁর অন্যান্য যুগান্তকারী ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে 'মৃণালিনী', 'বিষবৃক্ষ', 'কৃষ্ণকান্তের উইল', 'চন্দ্রশেখর', 'আনন্দমঠ', 'দেবী চৌধুরাণী', 'রাজসিংহ' (যা একটি সার্থক ঐতিহাসিক উপন্যাস) এবং তাঁর জীবনের সর্বশেষ উপন্যাস 'সীতারাম'
  • এছাড়া তিনি 'Rajmohan's Wife' শিরোনামে একটি অসাধারণ ইংরেজি উপন্যাসও রচনা করেছিলেন।
  • বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী' বাংলা সাহিত্যের প্রথম 'সার্থক' উপন্যাস হলেও, বাংলা সাহিত্যের একেবারে প্রথম উপন্যাসের মর্যাদা দেওয়া হয় প্যারীচাঁদ মিত্র রচিত 'আলালের ঘরের দুলাল' গ্রন্থটিকে।
  • এছাড়া, 'দুর্গেশনন্দিনী' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো—দুর্গের প্রধানের কন্যা
  • অন্যদিকে, বঙ্কিমচন্দ্র রচিত 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসের অমূল্য দুটি উক্তি হলো—"পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ" এবং "প্রদীপ নিবিয়া গেল", যা বাংলা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৫: গদ্যগ্রন্থ, প্রবন্ধ ও বঙ্গদর্শন পত্রিকা সম্পাদনা
  • উপন্যাস রচনার পাশাপাশি ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, ভাষা এবং সমাজবিষয়ক চিন্তাধারায় বঙ্কিমচন্দ্র অসংখ্য অমূল্য প্রবন্ধ রচনা করেছেন।
  • তাঁর বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ এবং প্রবন্ধ সংকলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো 'লোকরহস্য', 'বিজ্ঞানরহস্য', 'কমলাকান্তের দপ্তর', 'সাম্য', 'কৃষ্ণচরিত্র' এবং 'বিবিধ প্রবন্ধ'
  • এই গ্রন্থগুলোতে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য এবং সমাজ সংস্কারমূলক চিন্তাভাবনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে।
  • প্রবন্ধ রচনার বাইরে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা।
  • এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা, কারণ এর মাধ্যমেই বাংলার সাহিত্যিক সমাজে এক নতুন মননশীলতার উন্মেষ ঘটেছিল।
  • অবশেষে, ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ই এপ্রিল এই মহান সাহিত্যিক কলকাতায় তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সাল ও সাহিত্যকর্ম মনে রাখার 'Chronological Grouping' বা কালানুক্রমিক ছক কৌশল

সাল বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা/প্রকাশনা
১৮৩৮জন্ম
১৮৫২'সম্বাদ প্রভাকর' পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ (সাহিত্যচর্চার সূচনা)
১৮৫৮কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম স্নাতক (বিএ) উত্তীর্ণ
১৮৬৫প্রথম সার্থক উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী' প্রকাশ
১৮৬৬প্রথম রোমান্টিক উপন্যাস 'কপালকুণ্ডলা' প্রকাশ
১৮৭২'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা
১৮৮৫'প্রচার' পত্রিকায় 'নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধ প্রকাশ
১৮৯৪মৃত্যু
৬: 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধের পটভূমি ও প্রকাশনা
  • ঊনিশ শতকীয় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই অমর প্রবন্ধটি মূলত নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য একটি দিকনির্দেশনামূলক দলিল।
  • 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে 'প্রচার' নামক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
  • পরবর্তীতে, সাহিত্যিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বঙ্কিমচন্দ্র এটিকে তাঁর বিখ্যাত 'বিবিধ প্রবন্ধ' নামক গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেন।
  • প্রবন্ধটি সম্পূর্ণভাবে সাধু রীতিতে রচিত।
  • এখানে লক্ষণীয় যে, ঊনিশ শতকে বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক কালে 'বাংলা' শব্দটিকে 'বাঙ্গালা' বানানে লেখা হতো।
  • ভাষার বিবর্তনের ধারায় 'বাঙ্গালা' থেকে 'বাঙলা' এবং সর্বশেষে 'বাংলা' রূপটি স্থায়িত্ব লাভ করেছে।
৭: প্রবন্ধের মূল উপজীব্য, তাৎপর্য ও বৈশ্বিক আবেদন
  • এই প্রবন্ধটি আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও এর চিন্তার মৌলিকত্ব, গভীরতা এবং প্রখরতা সত্যিই অসাধারণ।
  • বঙ্কিমচন্দ্র এখানে সাহিত্য রচনার একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শ এবং উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনার লক্ষ্যে নতুন লেখকদের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
  • বক্তবের তাৎপর্য এবং গভীরতা বিচার করলে এই প্রবন্ধটির একটি সর্বকালীন এবং বৈশ্বিক আবেদন রয়েছে।
  • অর্থাৎ, এটি শুধু ঊনিশ শতকের লেখকদের জন্যই নয়, বরং বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল ভাষার সকল সাহিত্যিকের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।
  • নবীন লেখকেরা যদি বঙ্কিমচন্দ্রের এই মহৎ পরামর্শগুলো নিষ্ঠার সাথে মেনে চলেন, তবে লেখক এবং পাঠক সমাজ উভয়েই ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন এবং আমাদের মননশীল ও সৃজনশীল জগৎ ক্রমশ সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠবে।
৮: প্রথম নির্দেশনা - যশের আকাঙ্ক্ষা পরিহার
  • বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর নির্দেশনার একদম শুরুতেই বলেছেন, "যশের জন্য লিখিবেন না।"
  • অর্থাৎ, খ্যাতি, সুনাম বা সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কোনোভাবেই সাহিত্য রচনা করা উচিত নয়।
  • যদি কোনো লেখক শুধুমাত্র খ্যাতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কলম ধরেন, তবে তিনি কখনোই যশের অধিকারী হতে পারবেন না এবং তাঁর লেখার মানও অত্যন্ত নিম্নগামী হবে।
  • বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করতেন যে, কোনো কিছু পাওয়ার আশা নিয়ে সুসাহিত্য রচিত হতে পারে না; সাহিত্য সাধনা করতে হয় সম্পূর্ণ নিষ্কাম মন নিয়ে।
  • লেখা যদি গুণগত দিক থেকে উৎকৃষ্ট হয় এবং মানুষের কল্যাণে আসে, তবে যশ বা খ্যাতি লেখকের অজান্তেই তাঁর পদচুম্বন করবে। তাই লেখার মানের দিকেই লেখকের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিবদ্ধ থাকা বাঞ্ছনীয়।
৯: দ্বিতীয় নির্দেশনা - অর্থের লোভে সাহিত্য রচনার কুফল
  • বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটি হলো, "টাকার জন্য লিখিবেন না।"
  • অর্থের মোহে পড়ে সাহিত্য রচনা করলে লেখক তাঁর লেখার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য এবং বস্তুনিষ্ঠতার সাথে আপস করতে বাধ্য হন।
  • লেখার সময় একজন লেখকের মন হতে হয় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নির্মল এবং পক্ষপাতহীন। কিন্তু কিছু আর্থিক প্রাপ্তির আশা নিয়ে লিখতে বসলে লেখার মূল উদ্দেশ্যটিই ব্যাহত হয়।
  • এই প্রবন্ধে লেখক ইউরোপের উদাহরণ টেনে বলেছেন যে, ইউরোপে অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে এবং তারা টাকা পায়ও, অধিকন্তু তাদের লেখার মানও ভালো হয়।
  • কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, কারণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও সাহিত্যিক পরিবেশ ইউরোপের মতো এখনো ততটা উন্নত স্তরে পৌঁছাতে পারেনি।
১০: ইউরোপের সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট বনাম বাংলার বাস্তব অবস্থা
  • ইউরোপের দেশগুলোতে সাহিত্যচর্চা পেশা হিসেবে অনেক আগে থেকেই স্বীকৃত এবং সেখানে পাঠক সমাজের রুচি ও শিক্ষার মান অনেক উন্নত।
  • তাই সেখানে অর্থের বিনিময়ে লিখলেও লেখকেরা সাহিত্যের মানের সাথে আপস করেন না।
  • কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করে বলেছেন যে, আমাদের দেশে এখনো সেই দিন আসেনি। আমাদের দেশে অর্থের উদ্দেশ্যে লিখতে গেলে লেখকদের মধ্যে একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়।
  • আর্থিক লাভের আশায় লেখকেরা সাধারণ মানুষের সস্তা রুচিকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন, যা প্রকৃত সাহিত্যের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ।
  • এই তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলার তৎকালীন সাহিত্যিক পশ্চাৎপদতার একটি নগ্ন চিত্র অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন।
১১: লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি - সাহিত্যের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ
  • অর্থের জন্য লিখতে গেলে লেখকের মধ্যে যে অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রবণতাটি প্রবল হয়ে ওঠে, বঙ্কিমচন্দ্র তাকে বলেছেন 'লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি'
  • লোকরঞ্জন মানে হলো সাধারণ মানুষের বা জনসাধারণের মনোরঞ্জন বা সন্তোষ বিধান করা।
  • এদেশের সাধারণ পাঠকগোষ্ঠী শিক্ষা-দীক্ষা এবং রুচিশীলতার দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
  • এখন একজন লেখক যদি শুধুমাত্র সেই সাধারণ পাঠকের সস্তা রুচি এবং শিক্ষার কথা বিবেচনা করে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য লিখতে বসেন, তবে সেই রচনা অত্যন্ত বিকৃত এবং অনিষ্টকর হয়ে ওঠে।
  • কারণ পাঠককে খুশি করার জন্য লেখককে তখন গভীর চিন্তাশীলতার পথ পরিহার করে চটুল ও অগভীর বিষয়ের অবতারণা করতে হয়, যা সাহিত্যের চরম অবক্ষয় ডেকে আনে।
১২: তৃতীয় নির্দেশনা - সাহিত্য রচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য (মানবকল্যাণ ও সৌন্দর্য সৃষ্টি)
  • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে সাহিত্য রচনার প্রকৃত ও মহত্তম উদ্দেশ্য হলো মূলত দুটি: এক. মনুষ্যজাতির বা দেশের কিছু মঙ্গল সাধন করা এবং দুই. সৌন্দর্য সৃষ্টি করা।
  • তিনি নবীন লেখকদের প্রতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, লেখা শুরু করার আগে যদি লেখক নিজের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন যে তাঁর এই লেখাটি সমাজ ও মানুষের কোনো উপকারে আসবে কিংবা পাঠকের মনে এক অপূর্ব সৌন্দর্যবোধের উন্মেষ ঘটাবে, তবেই তাঁর সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হওয়া উচিত।
  • এই দুটি মহৎ উদ্দেশ্য ছাড়া সাহিত্য রচনা করা একেবারেই অর্থহীন।
  • সাহিত্যের মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ, সুন্দর এবং কল্যাণকামী সমাজ গঠন করাই লেখকের পরম পবিত্র দায়িত্ব।
১৩: নীচ ব্যবসায়ী ও যাত্রাওয়ালার সাথে অপলেখকদের তুলনার যৌক্তিকতা
  • যেসব লেখক মানবকল্যাণ বা সৌন্দর্য সৃষ্টির মতো মহৎ উদ্দেশ্যগুলোকে পাশ কাটিয়ে কেবল টাকা বা যশের মতো হীন উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করেন, বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাঁদের সমালোচনা করেছেন।
  • তিনি এই ধরনের অপলেখকদেরকে 'যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের' সাথে তুলনা করেছেন।
  • প্রাচীনকালে যাত্রাওয়ালারা নিছক মানুষের মনোরঞ্জন করে কিছু অর্থ উপার্জনের জন্য নিজেদের শিল্পের অবমাননা করত।
  • বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, যে লেখক অর্থের লোভে সস্তা ও বিকৃত সাহিত্য রচনা করেন, তিনিও সেই যাত্রাওয়ালার মতোই তাঁর পবিত্র লেখক সত্তাকে নিলামে তোলেন।
  • সাহিত্য কোনো সস্তা ব্যবসার সামগ্রী নয়, এটি জাতির বিবেকের দর্পণ; তাই একে কলুষিত করা চরম অবমাননাকর।
১৪: চতুর্থ নির্দেশনা - পরিহার্য বিষয়সমূহ এবং সাহিত্যের পরম ধর্ম
  • বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে, কোন ধরনের রচনাকে একজন লেখকের অবশ্যই পরিহার বা বর্জন করতে হবে।
  • তিনি বলেছেন, যা কিছু অসত্য বা মিথ্যা, যা কিছু ধর্মের অর্থাৎ নীতি-নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ, পরনিন্দা (অন্যের কুৎসা রটনা), পরপীড়ন (অন্যকে মানসিক বা শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে লেখা) এবং আত্মস্বার্থ সাধন যার মূল উদ্দেশ্য—সেই ধরনের প্রবন্ধ বা সাহিত্য কখনোই মানুষের জন্য হিতকর বা কল্যাণকর হতে পারে না।
  • এই ধরনের রচনা সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, তাই তা একেবারে পরিহার্য।
  • লেখকের সর্বদা মনে রাখা উচিত যে, সত্য এবং ধর্মই (অর্থাৎ ন্যায়ের পথই) সাহিত্যের একমাত্র পরম উদ্দেশ্য
১৫: অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণকে 'মহাপাপ' বলার অন্তরালের দর্শন
  • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর প্রবন্ধে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও গভীর দার্শনিক উক্তি করেছেন—"অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ।"
  • সত্য প্রতিষ্ঠা, ধর্ম বা ন্যায়ের পথ অনুসরণ, মানবকল্যাণ এবং সৌন্দর্য সৃষ্টি—এই পবিত্র উদ্দেশ্যগুলোর বাইরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার, কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা কেবল সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য কলম ধরাকে লেখক জঘন্য অপরাধ বা মহাপাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
  • কারণ, একটি বিকৃত ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখা হাজার হাজার মানুষের মননকে কলুষিত করতে পারে এবং সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
  • তাই সৎ মনোভাব ও পবিত্র উদ্দেশ্য ছাড়া সাহিত্য রচনা করাকে তিনি নৈতিকতার চরম স্খলন বলে রায় দিয়েছেন।
১৬: পঞ্চম নির্দেশনা - তাৎক্ষণিক প্রকাশনার বিরূপ প্রভাব ও সংশোধনের গুরুত্ব
  • বঙ্কিমচন্দ্রের পঞ্চম পরামর্শটি সাহিত্যিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য এক অনন্য নির্দেশিকা।
  • তিনি বলেছেন, "যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না।"
  • অর্থাৎ, কোনো কিছু লেখার সাথে সাথেই আবেগের বশবর্তী হয়ে তা প্রকাশ বা মুদ্রণ করা অত্যন্ত অনুচিত কাজ। লেখাটিকে কিছুকালের জন্য নিজের কাছে ফেলে রাখতে হবে।
  • নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর লেখক যখন সেই লেখাটি পুনরায় পাঠ করবেন, তখন তাঁর চোখে এমন অনেক ভুল-ত্রুটি বা অসংগতি ধরা পড়বে যা লেখার মুহূর্তে তিনি অনুধাবন করতে পারেননি।
  • বঙ্কিমচন্দ্র বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কাব্য, নাটক এবং উপন্যাসের মতো বিশদ সাহিত্যকর্মকে এক বা দুই বছর ফেলে রেখে তারপর সতর্কতার সাথে সংশোধন করলে তা বিশেষ উৎকর্ষ বা চূড়ান্ত শিল্পমান লাভ করে।
১৭: সাময়িক সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা ও লেখকের অবনতির কারণ
  • তাৎক্ষণিকভাবে লেখা প্রকাশ না করার এই সুবর্ণ নিয়মটি একটি বিশেষ শ্রেণির সাহিত্যের ক্ষেত্রে রক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে ওঠে, আর তা হলো 'সাময়িক সাহিত্য'
  • সাময়িক সাহিত্য বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের জন্য রচিত সাহিত্য।
  • সাময়িক সাহিত্যের প্রকাশকদের তাগিদ থাকে খুব দ্রুত লেখা জমা দেওয়ার।
  • ফলে এই ধরনের সাহিত্যের রচয়িতারা তাঁদের লেখাকে দীর্ঘ সময় ধরে ফেলে রাখার এবং সতর্কতার সাথে তা পুনরায় সংশোধন করার ন্যূনতম সুযোগ পান না।
  • তাড়াহুড়ো করে লেখার কারণে রচনাটি পরিণত ও কালজয়ী হয়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এই কারণেই বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন যে সাময়িক সাহিত্য লেখকের পক্ষে অত্যন্ত অবনতিকর এবং ক্ষতিকর
১৮: ষষ্ঠ নির্দেশনা - অধিকারবহির্ভূত বিষয়ে হস্তক্ষেপের অসারতা
  • বঙ্কিমচন্দ্রের ষষ্ঠ পরামর্শটি হলো, "যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য।"
  • এখানে 'অধিকার' বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর লেখকের গভীর জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও পারদর্শিতাকে বোঝানো হয়েছে।
  • যে বিষয় সম্পর্কে লেখকের সম্যক ধারণা বা কোনো প্রকার জ্ঞান নেই, সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভে সেই বিষয় নিয়ে লিখতে যাওয়া একেবারেই অনুচিত।
  • এটি একটি অত্যন্ত সোজা ও যৌক্তিক কথা হওয়া সত্ত্বেও, বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করে বলেছেন যে সাময়িক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই সাধারণ নিয়মটিও মোটেও রক্ষিত হয় না।
  • জ্ঞানহীন অবস্থায় কোনো স্পর্শকাতর বা জটিল বিষয় নিয়ে লিখলে তা পাঠক সমাজকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে।
১৯: সপ্তম নির্দেশনা - বিদ্যা প্রকাশের বৃথা চেষ্টা ও তার কুফল
  • অনেক নবীন লেখকের মধ্যে নিজের অগাধ পাণ্ডিত্য ও বিদ্যা জাহির করার একটি প্রবল ও হাস্যকর প্রবণতা দেখা যায়। বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রবণতাকে কঠোরভাবে পরিহার করতে বলেছেন।
  • তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, "বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করিবেন না।"
  • লেখকের অন্তরে যদি প্রকৃত বিদ্যা ও গভীর জ্ঞান থাকে, তবে তা তাঁর সাবলীল রচনার মধ্য দিয়েই অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপন মহিমায় প্রকাশ পাবে; এর জন্য আলাদা করে কোনো জোরজবরদস্তি বা কৃত্রিম চেষ্টার একেবারেই প্রয়োজন নেই।
  • উল্টো, জোর করে নিজের বিদ্যা জাহির করার এই অযাচিত চেষ্টা পাঠকের কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর হয়ে ওঠে এবং রচনার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিপাট্যকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।
২০: বিদেশি ভাষার উদ্ধৃতি বা কোটেশন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা
  • বিদ্যা জাহির করার এই অপচেষ্টার একটি অন্যতম উদাহরণ হলো লেখায় অপ্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষার ব্যবহার।
  • বঙ্কিমচন্দ্র লক্ষ করেছিলেন যে, তৎকালীন আধুনিক প্রবন্ধগুলোতে ইংরেজি, সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মান প্রভৃতি ভাষার কোটেশন বা উদ্ধৃতি খুব বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
  • তিনি নবীন লেখকদের অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন যে, যে ভাষা আপনি নিজে জানেন না বা বোঝেন না, অন্য কোনো গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে সেই অজানা ভাষা থেকে কখনোই কোনো উদ্ধৃতি আপনার লেখায় ব্যবহার করবেন না।
  • এটি এক ধরনের সাহিত্যিক প্রতারণা এবং হীনম্মন্যতা।
  • মাতৃভাষার প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ এবং স্বকীয়তা বজায় রাখাই একজন আদর্শ লেখকের প্রধান কর্তব্য।
২১: অষ্টম ও নবম নির্দেশনা - অলংকার প্রয়োগ ও রসিকতার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ
  • সাহিত্যে অলংকার (শোভা বা ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারী উপাদান) এবং ব্যঙ্গ বা রসিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেও, তা কখনোই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
  • বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন যে, লেখার স্থানে স্থানে অলংকার বা ব্যঙ্গের প্রয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু লেখকের মেধা ও মননের ভাণ্ডারে যদি সেই রসবোধ প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান থাকে, তবে তা প্রয়োজন অনুযায়ী আপন গতিতেই কলমের ডগায় এসে পৌঁছাবে।
  • আর যদি লেখকের নিজস্ব ভাণ্ডারে সেই উপাদানের চরম ঘাটতি থাকে, তবে হাজার মাথা কুটলেও তা আসবে না।
  • অসময়ে বা শূন্য ভাণ্ডার নিয়ে জোরপূর্বক অলংকার প্রয়োগ বা রসিকতার অপচেষ্টার মতো কদর্য, কুৎসিত এবং হাস্যকর বিষয় সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি নেই।
২২: প্রাচীন বিধি বনাম বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব পরামর্শ (বন্ধুবর্গকে পাঠ করে শোনানো)
  • অলংকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রাচীন বিধি প্রচলিত ছিল যে, লেখার যে স্থানে অলংকার বা ব্যঙ্গ খুব বেশি সুন্দর বলে মনে হবে, লেখকের উচিত নির্দয়ভাবে সেই স্থানটি কেটে বাদ দেওয়া
  • কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রাচীন বিধির সাথে সম্পূর্ণ একমত হতে পারেননি। তিনি এর একটি চমৎকার বিকল্প ও মনস্তাত্ত্বিক সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন।
  • তাঁর মতে, লেখকের যে অংশটিকে অত্যাধিক সুন্দর মনে হবে, তিনি যেন সেই স্থানটি তাঁর নিকটতম বন্ধুবর্গকে পুনঃপুনঃ (বারবার) পাঠ করে শোনান
  • যদি লেখাটি প্রকৃতপক্ষেই মানসম্মত না হয়ে থাকে, তবে দুই-চারবার পড়ার পর লেখকের নিজের কাছেই সেটি অত্যন্ত শ্রুতিকটু লাগবে এবং বন্ধুদের সামনে তা পড়তে তিনি চরম লজ্জা অনুভব করবেন। ঠিক তখনই সেই অংশটি নির্দ্বিধায় কেটে বাদ দিতে হবে।
২৩: দশম নির্দেশনা - সরলতাই শ্রেষ্ঠ অলংকার এবং শ্রেষ্ঠ লেখকের মাপকাঠি
  • ভাষার কাঠিন্য এবং অহেতুক আড়ম্বরকে বঙ্কিমচন্দ্র কখনোই সাহিত্যের মানদণ্ড হিসেবে স্বীকার করেননি।
  • তাঁর মতে, "সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা।"
  • সাহিত্য রচনার প্রধান এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হলো পাঠককে নিজের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝানো। যদি পাঠক লেখার মর্মার্থই উদ্ধার করতে না পারেন, তবে সেই রচনার কোনো মূল্যই থাকে না।
  • তাই বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, যিনি সোজা ও সহজ কথায় নিজের মনের গভীর ভাবগুলোকে সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে তুলতে পারেন, তিনিই হলেন প্রকৃত অর্থে শ্রেষ্ঠ লেখক।
  • ভাষার সারল্যই লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সফলতার মূল চাবিকাঠি।
২৪: একাদশ ও দ্বাদশ নির্দেশনা - অন্ধ অনুকরণ পরিহার ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ সংরক্ষণ
  • একাদশ নির্দেশনায় বঙ্কিমচন্দ্র অন্ধ অনুকরণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, "কাহারও অনুকরণ করিও না।"
  • কারণ, কাউকে অনুকরণ করতে গেলে মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতার কারণে সাধারণত তার দোষ বা ত্রুটিগুলোই বেশি অনুকৃত হয়, গুণগুলো নয়।
  • অমুক নামকরা লেখক এইভাবে লিখেছেন বলে আমাকেও ঠিক সেভাবেই লিখতে হবে—এই হীন চিন্তা কদাপি (কখনো) মনে স্থান দেওয়া উচিত নয়।
  • অন্যদিকে, দ্বাদশ নির্দেশনায় বস্তুনিষ্ঠতার উপর চরম জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, "যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না।"
  • লেখার প্রতিটি শব্দের স্বপক্ষে প্রমাণ সবসময় রচনার সাথে সংযুক্ত করার প্রয়োজন না হলেও, কেউ চ্যালেঞ্জ করলে যেন তাৎক্ষণিকভাবে তা উপস্থাপন করা যায়, সে জন্য প্রমাণ সর্বদা লেখকের হাতে মজুদ থাকা অপরিহার্য।
২৫: ত্রয়োদশ নির্দেশনা - বাঙ্গালার ভরসা ও সাহিত্যিকদের প্রতি চূড়ান্ত আহ্বান
  • প্রবন্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে বঙ্কিমচন্দ্র একাদশ, দ্বাদশ এবং অন্যান্য সকল নিয়মের সারসংক্ষেপ হিসেবে তাঁর ত্রয়োদশ ও চূড়ান্ত নির্দেশনাটি প্রদান করেছেন।
  • তিনি গভীর প্রত্যয়ের সাথে বলেছেন, "বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা।"
  • একটি জাতির সামগ্রিক মনন, সংস্কৃতি এবং উন্নতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার মাতৃভাষার সাহিত্য।
  • বঙ্কিমচন্দ্রের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তিনি যে সমস্ত নিয়মনীতি এবং নির্দেশনার কথা এই প্রবন্ধে এতক্ষণ ধরে সবিস্তারে আলোচনা করলেন, বাঙ্গালার নবীন লেখক সমাজ যদি সেগুলো নিষ্ঠার সাথে মেনে চলেন এবং সযত্নে রক্ষা করেন, তবে বাংলা সাহিত্যের উন্নতি অত্যন্ত প্রবল বেগে সাধিত হতে থাকবে।
  • বঙ্কিমচন্দ্রের এই আশাবাদ বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ পথচলার এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ।

শব্দার্থ ও টীকা

  • 'হিতকর' অর্থ কল্যাণকারী বা উপকারী।
  • 'কদর্য' অর্থ অত্যন্ত ঘৃণ্য বা কুৎসিত।
  • 'কদাচ' অর্থ কখনো বা কোনোকালে।
  • 'অকর্তব্য' অর্থ অনুচিত।
  • 'পরপীড়ন' অর্থ অন্যকে অত্যাচার বা নির্যাতন করা।
  • 'পরিপাট্য' অর্থ সৌন্দর্য বা গোছানো ভাব।

বঙ্কিমচন্দ্রের ১৩টি নির্দেশনার 'কীওয়ার্ড' (Keyword) ছক

নির্দেশনার ক্রম মূল কীওয়ার্ড (Keyword) মনে রাখার সূত্র (Brain Trigger)
১ম নির্দেশনাযশযশের বা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা বর্জন করতে হবে।
২য় নির্দেশনাঅর্থটাকার লোভে বা আর্থিক উদ্দেশ্যে লেখা যাবে না।
৩য় নির্দেশনাউদ্দেশ্যলেখার মূল উদ্দেশ্য হবে মানবকল্যাণ ও সৌন্দর্য সৃষ্টি।
৪র্থ নির্দেশনাপরিহার্যঅসত্য, ধর্মবিরুদ্ধ, পরনিন্দা ও পরপীড়নমূলক লেখা বাদ দিতে হবে।
৫ম নির্দেশনাঅপেক্ষা / সময়লিখেই হঠাৎ ছাপানো যাবে না, কিছুদিন ফেলে রাখতে হবে।
৬ষ্ঠ নির্দেশনাঅধিকারযে বিষয়ে নিজের জ্ঞান বা অধিকার নেই, তাতে হস্তক্ষেপ অনুচিত।
৭ম নির্দেশনাবিদ্যালেখায় জোর করে বিদ্যা বা পাণ্ডিত্য জাহির করা যাবে পণ্ডিত।
৮ম নির্দেশনাঅলংকারশূন্য ভাণ্ডার নিয়ে জোর করে অলংকার প্রয়োগ করা অনুচিত।
৯ম নির্দেশনারসিকতাজোরপূর্বক ব্যঙ্গ বা রসিকতা করার চেষ্টা করা যাবে না।
১০ম নির্দেশনাসরলতাসকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার হলো সরলতা।
১১তম নির্দেশনাঅনুকরণঅন্য কোনো লেখকের অন্ধ অনুকরণ করা যাবে না।
১২তম নির্দেশনাপ্রমাণযে কথার স্বপক্ষে প্রমাণ দেওয়া যাবে না, তা লেখা থেকে বিরত থাকতে হবে।
১৩তম নির্দেশনাভরসাবাঙ্গালা সাহিত্যই বাঙ্গালার বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভরসা।
২৬: ভর্তি পরীক্ষার জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ৫০টি এককথায় প্রকাশ (One-Liner Data)

কৌশল হিসেবে লিখবে, "এই ৫০টি তথ্য একটানা মুখস্থ না করে Active Recall পদ্ধতিতে পড়তে হবে। অর্থাৎ, প্রশ্নটি পড়ে হাত দিয়ে উত্তর ঢেকে মনে করার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া Spaced Repetition অনুযায়ী এগুলো আজ পড়ার পর, ঠিক ৩ দিন পর, এবং ৭ দিন পর পুনরায় রিভিশন দিতে হবে।"

১. সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জুন
২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রাম
৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পিতার নাম ছিল যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
৪. যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পেশায় ছিলেন একজন ডেপুটি কালেক্টর
৫. ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম স্নাতকদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম
৬. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর পেশাগত জীবনে একজন দাপুটে ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।
৭. খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বঙ্কিমচন্দ্র নীলকরদের চরম অত্যাচার দমন করেছিলেন
৮. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলা ভাষায় প্রথম শিল্পসম্মত ও সার্থক উপন্যাস রচনার একক কৃতিত্ব দেওয়া হয়।
৯. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত মোট গ্রন্থের সংখ্যা হলো ৩৪টি
১০. বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে 'সাহিত্যসম্রাট' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বিখ্যাত পত্রিকাটির নাম হলো 'বঙ্গদর্শন', যা ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয়।
১২. ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে 'সম্বাদ প্রভাকর' পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যিক জীবনের শুভ সূচনা ঘটে।
১৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম ছিল 'কমলাকান্ত'
১৪. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসের নাম 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫)
১৫. বাংলা সাহিত্যের সর্বপ্রথম রোমান্টিক উপন্যাস হলো বঙ্কিমচন্দ্র রচিত 'কপালকুণ্ডলা' (১৮৬৬)
১৬. 'Rajmohan's Wife' হলো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি বিখ্যাত ইংরেজি উপন্যাস।
১৭. 'রাজসিংহ' বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি অনবদ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস।
১৮. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত তাঁর জীবনের সর্বশেষ উপন্যাসটির নাম 'সীতারাম'
১৯. 'লোকরহস্য', 'বিজ্ঞানরহস্য', 'সাম্য', ও 'কৃষ্ণচরিত্র' হলো বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা বিখ্যাত গদ্যগ্রন্থ বা প্রবন্ধ।
২০. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ই এপ্রিল কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
২১. 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্রের 'বিবিধ প্রবন্ধ' নামক গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
২২. 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে 'প্রচার' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
২৩. এই সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি প্রমিত সাধু রীতিতে রচিত হয়েছে।
২৪. বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধে নবীন লেখকদের যশের জন্য লিখতে কঠোরভাবে বারণ করেছেন
২৫. যশের জন্য লিখলে লেখকের যশও লাভ হয় না এবং লেখার গুণগত মানও ভালো হয় না
২৬. বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, লেখার মান ভালো হলে যশ বা খ্যাতি আপনা থেকেই লেখকের কাছে ধরা দেয়
২৭. অর্থের উদ্দেশ্যে বা টাকার জন্য সাহিত্য রচনা করলে লেখকের মাঝে ক্ষতিকর লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে ওঠে
২৮. লোকরঞ্জন প্রবৃত্তি হলো সাধারণ মানুষের সস্তা মনোরঞ্জন বা সন্তোষ বিধান করার হীন প্রবণতা
২৯. সাধারণ পাঠকের রুচি বিবেচনা করে লোকরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য রচনা অত্যন্ত বিকৃত ও অনিষ্টকর হয়ে ওঠে।
৩০. ইউরোপের লেখকরা টাকার জন্য লিখলেও সেখানে লেখার মান ভালো হয়, কিন্তু আমাদের দেশে এখনো সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি
৩১. সাহিত্য রচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মনুষ্যজাতির মঙ্গল সাধন করা অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করা
৩২. যারা মহৎ উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য হীন উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করে, বঙ্কিমচন্দ্র তাদের যাত্রাওয়ালা ও নীচ ব্যবসায়ী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
৩৩. বঙ্কিমচন্দ্রের মতে, অসত্য, ধর্মবিরুদ্ধ, পরনিন্দা এবং পরপীড়নমূলক প্রবন্ধ কখনোই সমাজের জন্য হিতকর হতে পারে না।
৩৪. সত্য এবং ধর্মই হলো যেকোনো কালজয়ী সাহিত্যের একমাত্র ও প্রধান উদ্দেশ্য।
৩৫. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সত্য ও ধর্ম ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ করা মহাপাপ
৩৬. বঙ্কিমচন্দ্র পরামর্শ দিয়েছেন যে, কোনো কিছু লেখার পর তা হঠাৎ করে ছাপানো উচিত নয়, বরং কিছুকাল ফেলে রাখা উচিত
৩৭. কাব্য, নাটক এবং উপন্যাস দুই-এক বছর ফেলে রেখে তারপর সংশোধন করলে তা বিশেষ উৎকর্ষ বা চূড়ান্ত শিল্পমান লাভ করে।
৩৮. সাময়িক সাহিত্যের প্রকাশকদের তাগিদের কারণে এই সাহিত্য লেখকদের জন্য অত্যন্ত অবনতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
৩৯. যে বিষয়ে লেখকের কোনো অধিকার বা জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে লেখা বা হস্তক্ষেপ করা লেখকের জন্য সম্পূর্ণ অকর্তব্য।
৪০. বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করতে নিষেধ করেছেন, কারণ বিদ্যা থাকলে তা রচনার মধ্য দিয়ে আপনা থেকেই প্রকাশ পায়।
৪১. রচনার মধ্যে জোর করে বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের কাছে অতিশয় বিরক্তিকর এবং এটি রচনার পরিপাট্যের জন্য বিশেষ হানিজনক।
৪২. যে ভাষা লেখক নিজে জানেন না, সেই ভাষার কোটেশন বা উদ্ধৃতি ব্যবহার করাকে বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যিক প্রতারণা বলেছেন।
৪৩. অসময়ে বা শূন্য ভাণ্ডার নিয়ে জোরপূর্বক অলংকার প্রয়োগ বা রসিকতা করার চেষ্টার মতো কদর্য আর কিছুই নেই
৪৪. বঙ্কিমচন্দ্রের পরামর্শ হলো, রচনার যে স্থানটিকে অলংকারবহুল ও সুন্দর মনে হবে, তা বন্ধুবর্গকে পুনঃপুনঃ পড়ে শোনাতে হবে
৪৫. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার হলো সরলতা
৪৬. যিনি সোজা ও সহজ কথায় নিজের মনের ভাব পাঠকের কাছে স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেন, তিনিই হলেন শ্রেষ্ঠ লেখক
৪৭. বঙ্কিমচন্দ্র অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করেছেন, কারণ অনুকরণ করতে গেলে মানুষের স্বভাবদোষে কেবল দোষগুলোই অনুকৃত হয়, গুণগুলো নয়।
৪৮. যে কথার কোনো প্রমাণ লেখক দিতে পারবেন না, বঙ্কিমচন্দ্র সেই ভিত্তিহীন কথা লিখতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
৪৯. বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, বাঙ্গালা সাহিত্যই হলো বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাঙ্গালার মূল ভরসা
৫০. বঙ্কিমচন্দ্রের এই অমূল্য নিয়মগুলো রক্ষিত হলে বাংলা সাহিত্যের উন্নতি অত্যন্ত প্রবল বেগে সাধিত হতে থাকবে
২৭: এমসিকিউ (MCQ) হ্যাকস ও প্রশ্ন বিশ্লেষণ
  • ভর্তি পরীক্ষায় বঙ্কিমচন্দ্র থেকে আসা প্রশ্নের অপশনে প্রায়ই 'সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়' বা 'প্যারীচাঁদ মিত্র'-এর নাম দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয় (যেমন: প্রথম উপন্যাস কোনটি?)।
  • সঠিক উত্তর সরাসরি না খুঁজলে প্রথমে ভুল অপশনগুলো (Eliminate) লজিক্যালি বাদ দেওয়ার চর্চা করতে হবে।
  • যেমন: যদি প্রশ্ন আসে 'কোন উদ্দেশ্যে লেখনী ধারণ মহাপাপ?', অপশনে যদি 'যশ', 'অর্থ' এবং 'অন্য উদ্দেশ্য' থাকে, তবে প্রবন্ধের সুনির্দিষ্ট লাইন অনুযায়ী 'অন্য উদ্দেশ্য'-কেই সঠিক হিসেবে বেছে নিতে হবে।